আল মামুন

কমিউনিটি রেডিও : লোকবেতার যেনো কোনো রেডিও স্টেশন নয়— একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান!

কমিউনিটি রেডিও : লোকবেতার যেনো কোনো রেডিও স্টেশন নয়— একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান!

আল মামুন
উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের নতুন গণমাধ্যম কমিউনিটি রেডিও। এই মাধ্যমটি ইতোমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষ এর থেকে সুবিধা পেতে শুরু করেছেন। হাতের কাছে একটি গণমাধ্যম থাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর সোচ্চার হওয়া ও শোনার সুযোগ।
কমিউনিটি রেডিওর সাথে আমার পরিচয় খুব অল্প দিনের। কিছু দিন আগে বাংলাদেশ এনজিও’স নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনআরআরসি)’র একটা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে মুন্সিগঞ্জের রেডিও বিক্রমপুরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো। তখন ওখানে কাজ করতে গিয়ে এই মাধ্যমটিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি স্থানীয় একটা গণমাধ্যম সাধারণ মানুষের কতটা কাছে যেতে পারে কিংবা জন সম্পৃক্ত হতে পারে।
দ্বিতীয়বার কমিউনিটি রেডিও নিয়ে কাজ করার সুযোগ আসে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। বিএনআরআরসি’র পক্ষ থেকে আমাকে বরগুনার লোকবেতারে পাঠানো হয়েছিলো। কমিউনিটি রেডিও লোকবেতারে প্রচারিত অনুষ্ঠান বা তাদের কার্যক্রম স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কী প্রভাব ফেলেছে এবং এই মাধ্যমের সাথে তাদেরকে কতটা সম্পৃক্ত করতে পেরেছে—এ বিষয়ে কিছু প্রতিবেদন করার জন্য।
এই কাজ করতে গিয়ে আমি বরগুনায় দু’দিন অবস্থান করি। এসময় বেশ কিছু এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে কথা বলি। কথা বলে বুঝতে পেরেছি জাতীয় গণমাধ্যমের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে এই স্থানীয় গণমাধ্যম। তাছাড়া বরগুনার প্রত্যান্ত অঞ্চলের অনেক মানুষের ঘরেই টিভি নেই। তারা বিনোদনের মাধ্যম বলতে রেডিওকেই বোঝেন। আর লোকবেতার স্থানীয় গণমাধ্যম হওয়ায় তাদের কাছে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এ ধরনের গণমাধ্যম শুরু থেকেই সাধারণ মানুষ বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে এবং অতি সহজে তাদেরকে তথ্যে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে।
বরগুনা যেহেতু আমার অপরিচিত এলাকা তাই এ কাজে আমাকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন লোকবেতারের স্টেশন ম্যানেজার মনির হোসেন কামাল এবং প্রযোজক ইমরান হোসেন। ইমরানকে সাথে নিয়েই মূলত আমি বিভিন্ন এলাকায় যাই।
বরগুনার শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে কথা বলে লোকবেতারের কর্মকান্ডের বেশ ইতিবাচক একটিধারণা পাওয়া গেছে। এসব এলাকার সুবিধা বঞ্চিতমানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পই আমি শুনেছি যাদেও সাথে কথা বলেছি। এরমধ্যে একটি ঘটনা শুনে আমি অভিভূত হয়েছি। বরগুনার ৫ নং আয়লাপাতাকাটা ইউনিয়নের উত্তর ইটবাড়িয়া গ্রামের লাইলী বেগমের কবুতর পালন করে সফল হওয়ার গল্প প্রচারিত হয় লোকবেতারের ‘উন্নয়ন সংবাদে’।
আর এই গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হন কড়ইবাড়িয়া দারুচ্ছুন্নাত দাখিল মাদরাসার শিক্ষক মোজাম্মেল হক। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন লোকবেতারে। চেয়ে নেন সফল নারী উদ্যোক্তা লাইলী বেগমের মোবাইল নাম্বার। এরপর তার সঙ্গে কথা বলে একদিন সময় করে কয়েকজন বেকার যুবককে নিয়ে ঘুরে দেখে আসেন লাইলী বেগমের কবুতর পালনের পদ্ধতি। উদ্দেশ্য— তিনিও এভাবে কবুতর পালন করবেন। রেডিওর উন্নয়ন সংবাদ বা কোনো অনুষ্ঠান শুনে নিজে কিছু করার এই যে প্রেরণা— এমন দৃষ্টান্ত খুব একটা আমাদের সামনে নেই।
এমন অনেক ঘটনাই আছে যা হয়তো আমাদেরও অজানা। এই এক লোকবেতারই তো অসংখ্য বাল্যবিয়ে ভেঙে দিয়েছে। একটা গণমাধ্যম হয়েও এমন অনেক সামাজিক কর্মকান্ড করেছে হরহামশোই। লোকবেতার যেনো কোনো রেডিও স্টেশন নয়— এটি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান!
লোকবেতার কমিউনিটি রেডিও উপকূলবাসীর আশা ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি আবহাওয়াসহ বিভিন্ন দুর্যোগের খবর সঠিক সময়ে প্রচার করে থাকে। এর অনুষ্ঠানগুলো স্থানীয়দের নিয়ে এবং স্থানীয় ভাষায় নির্মিত বলে এটি শুনতে বেশ আগ্রহী হয় এসব এলাকার মানুষ। অধিকাংশ অনুষ্ঠানেই স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা থাকে।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মত স্থাপিত কমিউনিটি রেডিওগুলোর অর্জন ইতোমধ্যে সকল মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এক কথা বলা চলে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছে এই মাধ্যমটি।
কমিউনিটিভিত্তিক রেডিওতে সাধারণ সীমিত প্রযুক্তিও অল্প সংখ্যক মানুষ কাজ করে। ভৌগোলিক ভাবে এটি কম এলাকার মধ্যে পৌছতে পারে। কারণ সম্প্রচার কাজে ব্যবহৃত হয় কম শক্তিসম্পন্ন এফএম ট্রান্সমিটিার। এর প্রসার ঘটাতে লোকবল এবং ফ্রিকোয়েন্সি আরো বাড়ানো যেতে পারে। কারণ এর জনপ্রিয়তা দিনদিন বেড়েই চলেছে। সেক্ষেত্রে এর পরিধি বাড়ানো দরকার।
আমার কাছে মনে হয়েছে কমিউনিটি রেডিও উন্নয়ন কর্মকান্ডে জনগণের অংশগ্রহণকে সম্ভব করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ কাঠামো বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে কমিউনিটি রেডিওগুলো অনেক ভালো করতে পারবে।

বরগুনার ‘লোকবেতার’ কমিউনিটি রেডিও নিয়ে লেখা ১০টি প্রতিবেদন পড়ুন—

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *