আল মামুন

কমিউনিটি রেডিও : ‘মোগো রেডিও মোগো কতা কয়’

কমিউনিটি রেডিও : ‘মোগো রেডিও মোগো কতা কয়’

আল মামুন
কি যে কন! খালি নাম ক্যান, কামের কতাও হুনছি। ওইডার নাম অইলো লোকবেতার। রেডিওডা আমাগো ম্যালা উপকার করতে য়াছে। হেরা ঘূর্ণিঝড় থেইক্যা বাচনের কতা হয়। অল্প বয়সে বিয়া-যৌতুক বন্ধ করনের কতা কয়। লোকবেতার তো মোগো রেডিও, মোরা না হোনলে হোনবে কারা?
ঢাকা থেকে বাসে বরগুনা বাস স্টেশনে নেমে অটোরিকশায় লোকবেতারের কার্যালয়ে যেতে যেতে কথাবলি চালকের সঙ্গে—আপনাদের এখানে একটা রেডিও স্টেশন আছে, লোকবেতার, নাম শুনছেন কখনো? এমন প্রশ্ন করলে উপরের কথাগুলো বলে অনেকটা চমকে দেন চালক শাহ আলম।
কারণ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে কমিউনিটি রেডিওর যাত্রা অল্প কিছুদিন আগে। কিন্তু এরই মধ্যে এর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। স্থানীয় এই গণমাধ্যম হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। তার চাওয়া-পাওয়া তার ইচ্ছা সে নিজেই প্রকাশ করতে পারছে এর মাধ্যমে। অটোরিকশা চালক শাহ আলমের মত খেটে খাওয়া এমন অনেক মানুষই এতোদিনে বুুঝে গেছেন কমিউনিটি রেডিওর মানে।
দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ১৪টি কমিউনিটি রেডিও কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন দুর্যোগকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে সময়োচিত ও সঠিক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। এর মধ্যে লোকবেতার অন্যতম। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছে এসব কমিউনিটি রেডিও। আর এই মাধ্যম থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষেরা সকলে তার অবস্থান থেকে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। নিজেরা অংশ নিচ্ছেন আবার উপভোগও করছেন।
বন্যাও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমন এবং এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষেত্রে প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ তাদের জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারেএবং এ ধরনের দুরবস্থার সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি ও বিপদাশংকা হ্রাস করতে পারে এই কমিউনিটি রেডিও।
বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে যেখানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস, নদী ভাঙ্গন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিধ্বস ইত্যাদি ঋতুভিত্তিক ও নৈমিত্তিক দুর্যোগ, কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে আগেই বিপজ্জনক আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্ক সংকেত প্রচারের ব্যবস্থা জেলে, কৃষকসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সাবধান করে দিতে পারে।
এ বিষয়ে লোকবেতারের স্টেশন ম্যানেজার মনির হোসেন কামাল বলেন, জেলে সম্প্রদায়সহ উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ দুর্যোগের খবরাখরব লোকবেতারের মাধ্যমে সহজেই পেয়ে থাকে। ‘মহাসেন’র সময় বিদ্যুৎ ছিলো না। সে সময় লোকবেতার জেনারেটরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা অনুষ্ঠান প্রচার করেছে। আমরা পুরোটা সময়ই আবহাওয়াবার্তাসহ ঘূর্ণিঝড়ের সর্বশেষ খবর প্রচার করেছি। স্টুডিওতে জেলা প্রশাসক উপস্থিত থেকে সরাসরি শ্রোতাদের ফোন রিসিভ করে সমস্যার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, আমরা ৪২টি উপজেলা রমধ্যে ২৩টি কাভারেজ দিয়েছি। মহাসেনের আঘাতে বরগুনা এলাকায় আটজন মানুষ মারা গেছে। যারা লোকবেতারের ফ্রিকোয়েন্সির বাইরে ছিলো।
বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা বরগুনা। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এ জনপদের মানুষ সিডর, আইলা, মহাসেনসহ প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে আছে। একটার পর একটা দুর্যোগ তাদের সাজানো গোছানো সংসার একমুহূর্তে তাসের ঘরের মত তছনছ করে দিয়েছে। যে কারণে প্রকৃতির রোষানলে পড়ে হোঁচট খাওয়া মানুষগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর মনোবল হারিয়ে ফেলছে বারবার। তারপরও তারা বাঁচে, বাঁচতে হয়।
জেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল খালেক বলেন, লোকবেতার বরগুনার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে দুর্যোগের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলা সংক্রান্ত বিশেষ বুলেটিন প্রচার করছে যাতে জেলেরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে। কখন ইলিশ মাছ পোনা ছাড়ে, কখন মাছ ধরা নিষেধ, ধরলে কী ধরনের শাস্তি পেতে হবে—এসব খবর জেলেরা শুনে সচেতন হচ্ছে।
লোকবেতারের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বরগুনা অঞ্চলের সবমানুষ লোকবেতার শুনতে পায়না। এর ফ্রিকোয়েন্সি আরো বাড়ানো দরকার। তাছাড়া এর প্রচার সময়ও আরো বাড়ানো দরকার।
বরগুনা ডিকেপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন হাওলাদার বলেন, গ্রামের মানুষের চাহিদানুযায়ী কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবহাওয়ার তথ্যসহ বিভিন্ন ধরনের বার্তা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করছে লোকবেতার। বিশেষ করে তাদের ‘ক্যাম্পাস’ অনুষ্ঠানটি আমার খুব ভালো লাগে। এটি স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা হয়ে থাকে। যেটি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সহায়ক।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি জাকির হোসাইন মিরাজ বলেন, লোকবেতার বাল্যবিবাহ ও উত্ত্যক্তকরণ বন্ধ, নারী ও শিশু অধিকার, কৃষি, আবহাওয়া, দুর্যোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানএবং দৈনন্দিন সংবাদ তৈরি ও উপস্থাপনার কাজ করে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানগুলো স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তিনি কমিউনিটি রেডিওগুলোতে সরকারের আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানান।
মনির হোসেন কামাল বলেন, লোকবেতার যাত্রা শুরুর পর থেকেই শ্রোতাদের চাহিদার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রচার করে যাচ্ছে। শ্রোতারা যেহেতু প্রান্তিক জনগোষ্ঠি তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা আমরা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি এবং এক্ষত্রে আমরা অনেকটাই সফল।
কমিউনিটি রেডিও জনগোষ্ঠীকে তথ্যে প্রবেশাধিকার দেয়। কেননা, এ ধরনের রেডিও যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে। শিক্ষাও উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রধান চালিকাশক্তি তথ্য বিনিময় ও প্রচারকে কমিউনিটি রেডিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে থাকে।
এছাড়া কমিউনিটি রেডিও স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং ইস্যুগুলোর সম্প্রচার করে থাকে। পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজস্ব অভিমত নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়। সর্বোপরি কমিউনিটি রেডিও একটি জনগোষ্ঠীর সবাইকে তাদের নিজস্ব আগ্রহও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *