আল মামুন

‘বিষাদ সিন্ধু’র স্রষ্টা মীর মশাররফ হোসেন

‘বিষাদ সিন্ধু’র স্রষ্টা মীর মশাররফ হোসেন

আল মামুন

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মীর মশাররফ হোসেন বাংলা গদ্য সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। তিনি ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর কুষ্টিয়া শহর থেকে তিন মাইল পূর্বে গড়াই নদীর তীরের লাহিনীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মীর মোয়াজ্জেম হোসেন বিপুল ভূ-সম্পত্তির অধিকারী এক ধনাঢ্য জমিদার ছিলেন। তার মায়ের নাম দৌলতুন্নেছা।

মীর মশাররফ হোসেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। একাধারে তিনি উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাটকপ্রহসন, প্রবন্ধ রচনা করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম সাহিত্যিক রূপে খ্যাত ‘বিষাদ সিন্ধু’র অমর লেখক মীর মশাররফের লেখাপড়া বাল্যকালে প্রথমে নিজ গৃহে, পরে গ্রামের জগমোহন নন্দীর পাঠশালায় শুরু হয়। এরপর অল্প কিছু দিন কুমারখালী এমএন স্কুল ও কুষ্টিয়া হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৮৬০ সালে মীর মশাররফের মা দৌলতুন্নেসা মারা যান।

মায়ের মৃত্যুর পর মীর মশাররফ নিজ বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পদমদী গ্রামে ফিরে আসেন এবং পদমদী হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন। পরে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সে সময় মশাররফের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। এ বয়সেই তিনি সাহিত্য চর্চাশুরু করেন। সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ ও ধর্মবিষয়ক প্রায়৩৭টি বই রচনা করে গেছেন। এর মধ্যে রত্নাবতী, গৌরী সেতু, বসন্ত কুমারী, নাটক জমিদার দর্পণ, সঙ্গীত লহরী, উদাসীন পথিকের মনের কথা, মদীনার গৌরব, বিষাদ সিন্ধু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন। প্রথমে তিনি কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের সাপ্তাহিক গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা ও কবি ঈশ্বর গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় কিছু দিন কাজ করেন। এরপর ১৮৮০ সালে তিনি নানাবাড়ি এলাকা লাহিনীপাড়া থেকে ‘হিতকরী’ নামের একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।

মীর মশাররফ হোসেন প্রথম জীবনে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ (১৮৬৩) ও কবি ঈশ্বরগুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ (১৮৩১) পত্রিকায় টুকিটাকি সংবাদ পাঠাতেন। এ সুবাদে কাঙাল হরিনাথের সঙ্গে তার হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল, যা আমৃত্যু বহাল থাকে। এ কারণেই মীর মশাররফ হোসেনকে কাঙাল হরিনাথের সাহিত্য শিষ্য বলা হয়েছে।

মীর মশাররফ হোসেন বিবাহের পরনানা বাড়ি লাহিনীপাড়া থেকে প্রথম স্ত্রীর নামে ‘আজিজন নেহার’ নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন ১৮৭৪ সালে। সামান্য কয়েক মাস পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৯০ সালে তিনি ফের লাহিনীপাড়া থেকে ‘হিতকরী’ নামে একখানি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকার কোথাও সম্পাদকের নামছিল না।

হিতকরীর কয়েকটি সংখ্যা টাঙ্গাইল থেকেও প্রকাশিত হয়েছিল। এ পত্রিকাটির সহকারী সম্পাদক ছিলেন কুষ্টিয়ার বিখ্যাত উকিল রাইচরণ দাস। মীর একখানি (রবেনা সুদিন কুদিন কয়েকদিন গেলে) বাউল গান লিখে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘ফিকিরচাঁদ ফকিরের’ বাউল দলের সদস্য হন। ‘মশাবাউল’ ভণিতায় তিনি কয়েকখানি উৎকৃষ্ট বাউল সঙ্গীত রচনা করেছিলেন। সঙ্গীত সম্পর্কে মীরের বেশ ভালো জ্ঞান ছিল। তার ‘সঙ্গীত লহরীতে’ বিভিন্ন তালের অনেক উৎকৃষ্ট সঙ্গীত আছে।

বাংলা সাহিত্যের অমর প্রতিভা মীর মশাররফ হোসেন ১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর পদমদী গ্রামে ইন্তেকাল করেন। তাকে তার প্রিয়তমা স্ত্রী বিবি কুলসুমের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়েছে। কোনো কোনো জীবনী লেখক ১৯১২সালে পদমদীতে তার ইন্তেকালের কথা উল্লেখ করেছেন। গবেষকরা মনে করেন, ডিসেম্বর বছরের শেষ মাস হওয়ায় মৃত্যুসাল নিয়ে এ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

বিষাদসিন্ধুর অমর স্রষ্টা মীর মশাররফ হোসেন ও তার সৃষ্ট কর্ম নিয়ে বাংলা ভাষায় নানাবিধ কাজ হয়েছে। উচ্চতর পঠন-পাঠনেও তার উপস্থিতি রয়েছে। মুনীর চৌধুরী, শান্তনু কায়সার, শামসুজ্জামান খান, আবুল আহসান চৌধুরীসহ অনেক গবেষক ও সাহিত্যব্রতী তাকে নিয়ে মূল্যবান গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মতাকে বিশদভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *