আল মামুন

কর্মক্ষেত্রে করোনা ঝুঁকিতে শ্রমিকরা, নিশ্চিত করুন স্বাস্থ্য সুরক্ষা

কর্মক্ষেত্রে করোনা ঝুঁকিতে শ্রমিকরা, নিশ্চিত করুন স্বাস্থ্য সুরক্ষা

মহামারী প্রাণঘাতী নোভেল করোনাভাইরাসের আতঙ্ক কাটেনি এখনো। এর মধ্যেই খুলে দেওয়া হলো বন্ধ থাকা পোশাক কারখানাগুলো। ফলে কাজে যোগ দিতে হয়েছে শ্রমিকরা। কারণ কাজ ছাড়া তাদের বেঁচে থাকার কোনো পথ নেই তো। তবে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে পোশাক কারখানার ভেতরে যে ধরনের অবকাঠামো থাকা উচিত তা নেই।
কারখানায় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নির্দেশনা নেই; সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে যতোটা শারীরিক দূরত্ব রেখে কাজ করা উচিত, তার ব্যবস্থাও নেই বলেই চলে।পোশাক কারখানায় সেলাই মেশিন বসানোর ক্ষেত্রে দূরত্ব রাখার সঠিক নিয়ম মানা হয়নি। মেশিনের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব রাখা হলেও তা এক হাতের বেশি নয় অধিকাংশ কারখানায়। এছাড়া সুতো কাটা, ফিনিশিং বিভাগ এবং প্যাকিংয়ের কাজ যেসব বিভাগে হয়, সেখানে একজন থেকে আরেকজনের দূরত্ব থাকে কমই।আংশিকভাবে কিছু বড় পোশাক কারখানা স্বাস্থ্যবিধি বা নিয়ম-নীতি মানছে। তবে অধিকাংশ পোশাক কারখানাই তা মানছে না। এতে করে কারখানাগুলোতে দিন দিন বেড়ে চলেছে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা।লোক দেখানোর নামে পোশাক কারখানার গেটে স্বাস্থ্যবিধি লিখে রাখা হলেও ভেতরে শ্রমিকদের বসার ক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্ব রাখা হচ্ছে না বলেই চলে। নেই মাস্ক, পিপিই বা পর্যান্ত স্যানিটাইজার। এমন অবস্থা যদি হয় পোশাক কারখানাগুলোর চিত্র তাতে শঙ্কা বেড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ এপ্রিল নতুন করে কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। এরপর এ পর্যন্ত ৪০ থেকে ৪৫ জনের বেশি পোশাক শ্রামিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও সতর্ক করে বলেছে, পোশাক শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেওয়া হলে করোনার আসতে পারে দ্বিতীয় দফা ঢেউ। সরকারের প্রতি কর্মক্ষেত্রে করোনারোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এই সংস্থাটি।

আইএলও মনে করে, এ বিষয়ে নিয়োগকর্তা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত থেকে ও সংলাপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ এবং দেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ জোগান আসে এ খাত থেকে। এই বিপুল মুনাফার জোগান আসে মূলত পোশাক শ্রমিকদের সস্তা শ্রম থেকেই।

বছরের পর বছর জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে গতানুগতিক পথে এছাড়া বিভিন্ন অর্থনৈতিক অজুহাতে এ শিল্পের মালিকদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে সরকার। কিন্তু দেখা যায়, পোশাক শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে অনিশ্চয়তা লেগেই থাকে। করোনাভাইরাস ইস্যুতে নতুন করে সংকটে পড়ছে তৈরি পোশাক খাত।

মহামারী করোনাভাইরাসের প্রভাবে সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে কোনো ধরনের শিল্পকারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই না করতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর শিল্পমালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ নির্দেশনা উপেক্ষা করেই বেশ কিছু শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে গার্মেন্টস কারখানায়। এ ধরনের ঘটনা অমানবিক।

এমন সংকটকালীন শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ দেখা যাচ্ছে, বেতন-ভাতার দাবিতে গাজীপুর, সাভার এবং আশুলিয়ার এখনো আটটি কারখানার শ্রমিক বিক্ষোভ করেছে। শ্রমিকরা যেন সঠিক সময়ে তাদের বেতন বুঝে নিতে পারেন বিজিএমইএ নিশ্চয় বিষয়টি তদারকি করবে।

বর্তমান করোনার দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সামাজিক অসন্তোষ কাম্য নয়। পোশাক শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা দেওয়ার বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়াও প্রয়োজন।

কর্মক্ষেত্রে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত মেঝে পরিস্কার করা, পুরো কর্মস্থল পরিস্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা, হাত ধোয়া এবং স্যানিটাইজেশনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সরবরাহ করা এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে বিনামূল্যে কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহ করা দরকার। তাহলেই শ্রমিকদের জীবনের সুরক্ষার পাশাপাশি ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতি কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরে পাবে বলে আশা করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *