আল মামুন

ধুলোর শহরে বসবাস, জীবনটা হাসফাঁস!

ধুলোর শহরে বসবাস, জীবনটা হাসফাঁস!

আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা; স্বপ্নে শহর ঢাকা। আমরা যারা এই ঢাকা শহরে থাকি তারা জানি কতোটা নিদারুণ কষ্ট নিয়ে আমাদের এখানে বসবাস করতে হয়। সুস্থ থাকাটা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে আমাদের জন্য। প্রতিদিনই ধুলোর শহর হয়ে উঠছে স্বপ্নের এই রাজধানী শহর। ঢাকার বাতাস এখন বিষাক্ত। রাস্তায় বেরোলেই ধুলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
ঢাকাবাসীকে নিত্যনতুন কতো রকম যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, তা বলে শেষ করা যাবে না। আমরা ভেজাল খাদ্য খাই। এমন কোনো একটি খাদ্য, পণ্য নেই যাতে ভেজালের অস্তিত্ব নেই। বেশিদিন ধরে পচন ঠেকাতে খাদ্যপণ্যে এমন সব রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হয়ে থাকে যা খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া খুব স্বাভাবিক।
গাড়ির পোড়া কালো ধোঁয়ায় আমরা প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছি। প্রকাশ্যে ধূমপান দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও সর্বত্রই চলছে প্রকাশ্যে ধূমপান। এতে অধূমপায়ীদেরও ধূমপানের ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে ধুলাদূষণ। কোথাও বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ারও উপায় নেই। নিঃশ্বাস নিতে গেলে যেনো দম বন্ধ হয়ে আসে।
ঢাকার প্রায় বেশিরভাগ জায়গাতেই অধিকাংশ সময় বিভিন্ন উন্নয়ন বা সংস্কার কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি লেগেই থাকে। যে কারণে মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে চলেছে ধুলো। দূষিত হচ্ছে বাতাস। আর পড়ছি ঝুঁকিতে।
তাছাড়া বর্তমানে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর ঢাকায় ধুলোবালি আরও বেড়েছে। যে কারণে ধুলার আধিক্য বহুগুণে বেড়েছে। দূষিত হচ্ছে বায়ু। ধুলার কারণে একদিকে বেড়েছে ভোগান্তি, অন্যদিকে রোগবালাই।
গত ৬ জানুয়ারি রাত পৌনে আটটায় বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। এরপর ছিলো ভারতের দিল্লি ও পাকিস্তানের করাচি। এর আগে ২৪ নভেম্বর রাত পৌনে নয়টায়ও ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। এভাবে প্রায়ই দূষিত নগরীর শীর্ষে উঠে আসে আমাদের প্রিয় ঢাকা শহর। এ পরিস্থিতিতে রাজধানীবাসী, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেট্রোরেলসহ চলমান কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে রাজধানী ঢাকার কয়েকটি এলাকা ধুলোর রাজ্যে পরিণত হয়েছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ইটভাটার দূষণ।
গত বছরের ২৬ নভেম্বর ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার বায়ুদূষণ কমাতে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের জন্য পরিবেশ সচিবের নেতৃত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এর আগে ২০১৮ সালেও এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তখন বায়ুদূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানোর নির্দেশও দিয়েছিল হাইকোর্ট। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন রোধ করা যাচ্ছে না নগরীর ধুলা দূষণ। ফলে এর বিরূপ প্রভাব দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।
বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি অ্যাজমা, সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ), এলপিডি (লিম্ফোপ্রোলিফারেটিভ ডিজিজ) ইত্যাদি রোগও দেখা দিচ্ছে। এলপিডির মতো রোগ আগে খুব একটা দেখা না গেলেও ধুলার কারণে এখন এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।
উন্নয়নমূলক কাজ ছাড়াও শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা নগরীতে ধুলাদূষণের প্রকোপ অত্যন্ত বেড়ে যায়। এবার শুষ্ক মৌসুম ভালোভাবে আসার আগেই ঢাকায় শুরু হয়েছে ধুলোর বিপদ। ঢাকার অনেক স্থানেই উন্নয়ন কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, তাতে দূষণের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) তথ্য অনুসারে, রাজধানীর বায়ুদূষণের ৫০ ভাগ হয় ইটভাটা থেকে, ৩০ ভাগ হয় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও সিটি করপোরেশনের বর্জ্য থেকে। ১০ ভাগ দূষণ হয় গাড়ির জ্বালানি থেকে। আর ১০ ভাগ হয় শিল্প কারখানার বর্জ্য থেকে। এই দূষণ কমাতে জরুরি ভিত্তিতে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধের পাশাপাশি রাস্তাগুলোতে প্রতিদিন পানি দেয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রত্যাশা করবো, দ্রুত সময়ের মধ্যে ধুলাদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সব মহল কার্যকর উদ্যোগ নেবে। কারণ এর সঙ্গে সুস্থ জাতি ও সার্বিক অগ্রগতির সম্পর্ক জড়িত।
বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে এ শহরের চারপাশে অবস্থিত ইটভাটাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব ক্ষুদ্র কণা (মাইক্রো পলুটেন্ট) বাতাসে মিশে একে দূষিত করে তার ৩৮ শতাংশই আসে ইট ভাটার চিমনি থেকে। অন্যদিকে, মোটরযান ১৯ শতাংশ, রাস্তার ধুলা ১৮ শতাংশ, মাটির কণা নয় শতাংশ ও ধাতু গলানোয় সাত শতাংশ মাইক্রো পলুটেন্ট বাতাসে মিশছে।
ঢাকার বায়ু দূষণ দূর করার জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণে সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ইটভাটা করতে হবে। যানবাহনের কার্বন নিঃসরণমাত্রা পরীক্ষা করে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকলে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ রাখতে হবে। শিল্পকারখানায় মনিটরিং জোরদার করতে হবে। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু, সিমেন্ট, ইট ইত্যাদি পরিবহন ও মজুতের সময় ঢেকে রাখতে হবে।
এছাড়াও, নিয়মিত রাস্তা পরিচ্ছন্ন ও ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে। সড়ক নির্মাণ ও মেরামত এবং সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয় করে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা; উন্মুক্ত স্থানে আবর্জনা না পোড়ানো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *