আল মামুন

স্বপ্ন দেখলে নিজের সঙ্গে বাংলাদেশকে নিয়েও দেখবে

স্বপ্ন দেখলে নিজের সঙ্গে বাংলাদেশকে নিয়েও দেখবে

শিক্ষার্থী ও তরুণদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন ড. এ পি জে আবদুল কালাম। শুধু নিজ দেশের তরুণদের জন্য নয়— অন্যদেশের তরুণদের নিয়েও ছিলো তাঁর সমান ভাবনা। তাই তো বাংলাদেশে এসেও তরুণ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি খোলামনে কথা বলেছেন, ভাবনা বিনিময় করেছেন। নতুন দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দিয়েছেন নানা দিক-নির্দেশনা।

শিক্ষার্থীদের সামনে কথা বলতে পেরে খুবই আপ্লুত ছিলেন ড. কালাম। বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানানোর সময়ও তিনি আয়োজকদের জিজ্ঞেস করেছিলেন এখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকবে কিনা। কারণ তিনি সব সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করতেন। তিনি চাইতেন প্রতিটি শিক্ষার্থীদের মনে স্বপ্নবীজ বুনে দিতে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. কালাম নিজের জীবনের উত্থান ও পতনের গল্প বলেন। বক্তৃতাজুড়েই জীবনের স্মৃতিচারণার মধ্যদিয়ে তিনি তরুণদের উজ্জীবিত করেন। কবি জালালউদ্দিন রুমির কবিতা তার মধ্যে বুনে দিয়েছিল স্বপ্নের বীজ— সে কথাও তিনি শিক্ষার্থীদের জানান। আলোচনার শুরুতেই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন— ‘সাফল্যের জন্য চাই সততা ও কঠোর পরিশ্রম। জীবনের লক্ষ্য অনেক বড় হতে হবে। স্বপ্ন হতে হবে বিশাল।’

হোটেল সোনারগাঁওয়ের ওই অনুষ্ঠানে ৬০০ শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে ৪০ মিনিট বক্তব্য রেখেছিলেন এ পি জে আবদুল কালাম। তিনি বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো এবং ‘কিছু’ বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান। বাংলাদেশকে ভালো লাগার কথা জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন ড. কালাম। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন— ‘বাংলাদেশকে আমার দুটি কারণে অনেক ভালো লাগে। এক— এ দেশের বিস্তৃত জলরাশি। আজও যখন দিল্লি থেকে তোমাদের এখানে উড়ে আসছিলাম তখন বিমানে বসে দেখছিলাম দেশজুড়ে কত নদী। এতো নদী! আসলে তোমাদের নাম হওয়া উচিত ছিলো ‘ওয়াটার পিপল’! তোমরা খুব সৌভাগ্যবান। আর দুই— তোমাদের তৈরি পোশাকশিল্প। তোমরা নিজেরাও হয়তো জানো না যে পোশাকশিল্পে তোমরা কতটা এগিয়ে গেছো! আর হ্যাঁ, অবশ্যই আমার ভালো লাগার একটা বড় অংশজড়ে আছ তোমরা— এ দেশের তরুণরা। তোমাদের দেশের জনসংখ্যা অনেক হতে পারে। কিন্তু মনে রাখবে এর অর্ধেকই তোমরা। তোমাদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তাভাবনা ও কাজকর্মের ওপরই দেশের উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করছে। বাংলাদেশেরও উচিত তোমাদের শক্তিমত্তার কথা মাথায় রেখে তোমাদের যথাযথ ব্যবহার করা। আর তাই আমার একটি পরামর্শ রইল তোমাদের প্রতি। এখন থেকে সবকিছুতে দেশের কথা মাথায় রাখবে। কোনো স্বপ্ন দেখলে নিজের সঙ্গে বাংলাদেশকে নিয়েও দেখবে, কোনো চিন্তা করলে বাংলাদেশকে নিয়ে করবে আর কোনো কাজে মগ্ন হলে বাংলাদেশের জন্য করবে।’

ভারতের তরুণদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণের মিল আছে উল্লেখ করে ড. কালাম বলেন— ‘ভারতের তরুণদের সঙ্গে তোমাদের অনেক মিল আছে। যেমন মিল আছে দুই দেশের ইতিহাস থেকে শুরু করে শিল্প-সংস্কৃতি আর সম্পদে। অর্ধশত নদী আমাদের দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবহমান। বিশ্বের সব থেকে সুন্দর এবং সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও এই দুই দেশজড়ে রয়েছে। তাই এই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অনেক অটুট। আমার ৮৩ বছরের জীবদ্দশায় গত দুই দশক ধরে দেশে এবং দেশের বাইরে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ তরুণের সংস্পর্শে এসেছি শুধু তাঁদের স্বপ্ন কী সেটা জানতে। তাই যখন তোমাদের কাছে আসার সুযোগ পেলাম সে সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাইনি।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর জীবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার কথা জানান। বলেন— ‘তোমাদের যখন পেলামই তখন আমার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি আমি আজ আলোকপাত করব। সেগুলি হল— জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, জ্ঞান আহরণ, অনেক বড় সমস্যায় পড়লেও লক্ষ্য থেকে সরে না আসা এবং কোনো কাজে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোকেই নেতৃত্বগুণে সামাল দিতে পারা। প্রথমেই তোমাদের আমার একটা ছোট্ট গল্প শোনাতে চাই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার এক স্কুলশিক্ষক ছিলেন শিব সুব্রামনিয়াম আয়ার, যাঁকে দেখলে ‘জ্ঞানের বিশুদ্ধতা’ কথাটার মানে বোঝা যায়। সেই শিক্ষক একদিন একটি পাখির ছবি এঁকেছিলেন। অনেকক্ষণ ধরে শিখিয়েছিলেন পাখি কীভাবে আকাশে ওড়ে। বলেছিলেন, কালাম কখনো কি উড়েতে পারবে এই পাখির মতো? সেই থেকে আমার আকাশে ওড়ার স্বপ্নের শুরু।’

ড. কালাম বলেন— ‘ঠিক উড়তে গেলে কী করতে হবে সেটা আমি বলব না। সেটা তোমরা নিজেরাই ঠিক করে নেবে। তবে আমি তোমাদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতে পারি। কথাগুলো তোমরা আমার সাথে বল— সব সময় জীবনের অনেক বড় লক্ষ্য রাখব। মনে রাখব ছোট লক্ষ্য অপরাধের সমান। আমি অব্যাহতভাবে জ্ঞান আহরণ করে যাব। সমস্যা সমাধানের অধিনায়ক হব। সমস্যার সমাধান করব। সমস্যাকে কখনো আমার ওপর চেপে বসতে দেব না। যত কঠিন সময়ই আসুক না কেন কখনোই হাল ছেড়ে দিব না। এভাবেই আমি একদিন উড়ব।’

তিনি সবাইকে অনেক বড় স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন— ‘সবাইকে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। সর্বদা চিন্তা করবে, আমাকে যেন মানুষ মনে রাখে। কিন্তু মানুষ কেন মনে রাখবে, সেটি ঠিক করতে হবে।’

তাঁর বক্তৃতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বলেন— ‘এই যে চারপাশে এত আলো দেখছ, বাতি দেখছ, বলো তো এই বাতি দেখলেই প্রথমে কার কথা মনে পড়ে? ঠিক, টমাস আলভা এডিসন। এই যে যোগাযোগের জন্য টেলিফোন, এটা দেখলে কার কথা মনে পড়ে? আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। একইভাবে এই বাংলাদেশের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই কার কথা মাথায় আসে বলো তো? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবাই তাঁকে মনে রেখেছে। এভাবে সবাইকে স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে। এমন কিছু করে যাবে, যাতে তোমার অনুপস্থিতিতেও পৃথিবী তোমাকে মনে রাখে।’

এরপর নিজের ক্ষেপণাস্ত্র বানানো প্রসঙ্গে বলেন— ‘ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কথা যখন এলো তখন বলি, সফল হলেও প্রথমে কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম। আর ওই ব্যর্থতাই আমাকে সফল হতে উজ্জীবিত করেছিল। চ্যালেঞ্জ হলো এই ব্যর্থতাকে দূর করে সফল হওয়ার পথ খুঁজে নিতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বের গুণের। সবার মধ্যে যে গুণটি অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। মনে রাখবে, একজন যোগ্য নেতার একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্য, পরিকল্পনা ও যে কোনো অবস্থা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতা থাকতে হবে। তাঁকে হতে হবে সৎ ও উদার মনের। সফলতাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে কিন্তু ব্যর্থতাকে নিজের করে নেয়ার ব্যাপারে দৃঢ় হতে হবে।’

শিক্ষার্থীদের ড. কালাম বলেন— ‘সমস্যাকে কখনো এড়িয়ে যেতে চাইবে না। বরং সমস্যা এলে তার মুখোমুখি দাঁড়াবে। মনে রাখবে, সমস্যাবিহীন সাফল্যে কোনো আনন্দ নেই। সব সমস্যার সমাধান আছেই। জ্ঞান আহরণ থেকে কখনো বিরত থেকো না। কারণ এই জ্ঞানই তোমাকে মহানুভব করে তুলবে। অন্য গুণাবলি অর্জনে সাহায্য করবে। নিজেকে অনন্য সাধারণ করে তোলার চেষ্টা করো। মনে রাখবে, তোমার চারপাশের পৃথিবী সর্বদা তোমাকে সাধারণের কাতারে নিয়ে আসার চেষ্টায় লিপ্ত। হতাশ না হয়ে নিজেকে স্বপ্নপূরণের কতটা কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারছ সেদিকে নজর রাখবে। কখনোই সাহস হারাবে না। নিজের একটি দিনও যাতে বৃথা মনে না হয় সে চেষ্টা করো।’

প্রশ্নোত্তর পর্ব্যে এক মেয়ে প্রশ্ন করার জন্য হাত তুলেন। ইশারায় অনুমতি দিতেই মেয়েটি গেয়ে ওঠে— ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ…’ সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গেয়ে ওঠে জন্মদিন সংগীত। উনি লজ্জা পেয়ে চুপচাপ মুচকি মুচকি হাসছিলেন! (বাংলাদেশে আসার দুদিন আগেই ছিল তাঁর জন্মদিন)।

শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহের কারণেই নিজেকে তিনি মেলে দিয়েছিলেন। ক্লান্তিহীনভাবে সবার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। দীর্ঘ ৪০ মিনিট ধরে জীবন-দর্শন, বিশ্বাস, চিন্তা, মেধা, পরিশ্রম, দেশ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বারবার বলছিলেন, ‘স্বপ্ন দেখো। স্বপ্ন দেখলেই স্বপ্ন ধরা দেবে।’ এরপর সবার শুভকামনা জানিয়ে বক্তৃতা শেষ করেন। বলেন— ‘তোমরা সবাই ভালো থাকবে, সবাই কোনো না কোনো দিন উড়বে।’

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *