আল মামুন

ভারত নির্মাণের রূপকার

ভারত নির্মাণের রূপকার

বিজ্ঞানী ড. কালাম শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বানিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি কিংবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে বসেই শুধু দিন কাটাননি। তিনি তাঁর দেশ—ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য সামগ্রিকভাবে চেষ্টা করছেন। শুধু প্রযুক্তি ক্ষেত্রেই নয়—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করেছেন। ২০২০ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য রূপকল্প ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিলো ভারতকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে দেখার। আর এ জন্য ড. কালাম ভারতের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছেন। কথা বলেছেন দেশের সর্বস্তরের মানুষের সাথে। আলোচনা করেছেন ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

ড. কালামের জন্ম রামেশ্বরম গ্রামে এবং তিনি বেড়েও উঠেছিলেন ওই গ্রামে। ওখানকার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাঁর মনে প্রায় প্রায়ই ভেসে উঠতো কিভাবে গ্রামের লোকদের আয় উপার্জন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ানো যায়। তিনি বলেন— ‘আমার পেশাগত কাজ বৃহত্তর নগরীতে হলেও দূরদূরান্তের এলাকাতে যাবার বেশ কয়েকটা সুযোগ ঘটেছিলো আমার। ভারতের ৬০০,০০০ গ্রামের উন্নয়ন করার মধ্যেই ইনডিয়া ২০২০ প্রোগ্রামের উন্নয়নধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিহিত ছিলো।

ড. কালাম বিশ্বাস করতেন— ‘২০২০ সালের মধ্যে ভারত একটি উন্নত দেশের মর্যাদায় পৌঁছতে পারে। ভারতীয় জনগণ দারিদ্রতা থেকে উৎরিয়ে উঠতে পারে এবং তাদের নিজস্ব উন্নত স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নিজ-খরচার কারণে দেশের উৎপাদন আরো বেশি অবদান রাখতে পারে।’

তিনি দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মিশনকে সফল করার জন্য পাঁচটি মূল লক্ষ্য স্থির করার কথা বলেছেন। এগুলো হলো— কৃষি ফল প্রক্রিয়াকরণ; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা; অবকাঠামো উন্নয়ন; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন; জটিল প্রযুক্তি সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা। এছাড়া তিনি সমন্বিত পন্থায় উন্নয়ন হিসেবে খাদ্য, অর্থ আর জাতীয় নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করেছেন।

তিনি মনে করতেন— ‘ভারতের উন্নয়ন আর জ্ঞানী সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্ব শর্ত হচ্ছে উপযুক্ত, সফল, স্বচ্ছ সরকার। ভারতের উন্নয়নের জন্য গ্রাম, জেলা ও রাজ্য পর্যায়ে সমন্বিতভাবে বিকেন্দ্রীয় করা প্রয়োজন। প্রাইভেট আর পাবলিক সেক্টরের অংশ গ্রহণের মাধ্যমে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত পরিকল্পনা সমূহ বাস্তবায়ন করা।’

ভারতের গ্রামীণ নাগরিকদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে তাদের নিরলসভাবে সহযোগিতা করতে গবেষণা কাজে উৎসাহ দান, ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্য লোকজনের যোগ্য কাজের ব্যবস্থা করা, সিনিয়র সিটিজেনদের কাছে জীবনযাপনের ধারা পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনী প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন ড. কালাম।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবহেলিত নার্সদের উন্নয়নসহ পুলিশ বিভাগের সংস্কার, পুলিশ স্টেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে তার মতামত উপস্থাপন করেন। দুঃস্থ তুলাচাষীসহ সকল কৃষকদের সাথে আলাপ করে সমস্যা বোঝার চেষ্টা করেছেন। এবং তা সমাধানের জন্য কৃষি বিশেষজ্ঞদের সাথে তার ধ্যান-ধারণা শেয়ার করেছেন। এমনকি পোস্টমাস্টারদের সাথে মতবিনিময়ও করেছেন।

ড. কালাম সমাজের সব আলোকিত মানুষের সংস্পর্শে গিয়ে নিজেও আলোকিত হবার চেষ্টা করতেন। তিনি বলেছেন— ‘সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শিশু, বাবা-মা, শিক্ষক, চাকরিজীবী, প্রশাসক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সেবিকাসহ অন্যান্যদের কাছ থেকে যে শপথ উচ্চারিত হয় তার আলোকে আমিও আলোকিত হই।’

ড. কালাম রাষ্ট্রপতি থাকাকালে দেশের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে অবহিত করতে তাঁর কাছে অসংখ্য চিঠি, ইমেইল পাঠাতো জনগণ। যেগুলো পাঠাতো শিশু-কিশোর, যুবক, প্রবীণ, শিক্ষক এমনকি বিজ্ঞানীরাও। তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করতেন সেসব চিঠির জবাব দেওয়ার। চিঠিতে যেসব সমস্যার কথা তাকে জানানো হতো তা তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করতেন।

ড. কালামের মিশন ছিলো ভারতকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা যাতে জনগণ দারিদ্রতা, নিরক্ষরতা আর বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি ‘উন্নয়নকামী রাজনীতির’ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। তিনি বলেছেন— ‘আমি দেখতে পছন্দ করি এমন একটা অবস্থা যাতে আমাদের দেশে উন্নয়নকামী রাজনীতির চর্চা হয়। তাঁদের মেনোফেস্টোতে প্রতিফলিত হবে উন্নয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনৈতিক ভিশন।’

ড. কালাম সব সময় সুখী-সমৃদ্ধ একটি দেশ হিসেবে ভারতকে দেখতে চাইতেন। তিনি ভারতেকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ড. কালাম তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিদায়ী ভাষণে বলেছিলেন— ‘আমার প্রিয় দেশবাসী, আসুন আমরা একটি দেশের মিশনকে সফল করতে কাজ চালিয়ে যাই যাতে সমৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সেবা, নিরাপত্তা, সুখ ও শান্তির ধারা টেকসইভাবে প্রগতির পথে চালিত হয়।’

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *