আল মামুন

রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ‘শান্তিপূর্ণ’ হলে পুলিশের লাঠিচার্জ কাম্য নয়

রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ‘শান্তিপূর্ণ’ হলে পুলিশের লাঠিচার্জ কাম্য নয়

আল মামুন
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনটি নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। এই নির্বাচনকে বিরোধী দলগুলো মেনে নেয়নি। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল নির্বাচন বলতে চাইছে।
‘যে নির্বাচনটি হয়েছে, তা আমাদের ইতিহাসে বিরল ও ব্যতিক্রম হয়ে থাকবে। এ রকম নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষ আর দ্বিতীয়বার প্রত্যক্ষ করেনি’- এই পক্ষে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলেরই যুক্তি আছে।
বিরোধীরা বলবে অবৈধ হিসেবে আর ক্ষমতাসীনরা বলবে সফল হিসেবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেমন ‘বিপুল ভোটে’ জয় পেয়েছে তেমনই বিএনপি বা তাদের জোটের পরাজয় হয়েছে ‘অত্যন্ত করুণভাবে’।
নিউইয়র্ক টাইমসসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করতে চাইছে। এমনকি ক্ষমতাসীন জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) অতি উৎসাহী সরকারি কর্মকর্তারা রাতে ব্যালটে সিল মেরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অভিযোগ এনেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) ৫০টি আসনে জরিপ চালিয়েছে বলে দাবি করছে। তারা নির্বাচনকে ‘অভূতপূর্ব’ ও ‘অবিশ্বাস্য’ বলে অভিহিত করেছে।
নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলো বড় কোনো আন্দোলন করতে না পারলেও তারা বিভিন্নভাবে বলতে চাইছে যে ‘আমরা এই নির্বাচনকে মানি না।’ তারা সরকারকে পদত্যাগ করে নতুন করে নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়েছে।
গত সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর, সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এ কর্মসূচি পুলিশের লাঠিচার্জে পণ্ড হয়ে গেছে। এ সময় নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেসবের ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এতে জোনায়েদ সাকিসহ ৩০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজনকে মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত পাঁচ পুলিশ সদস্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। বাকিদেরও প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। ৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
বাম জোটের নেতাকর্মীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে কালো পতাকা মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাওয়ার পথে হাইকোর্টের কাছে কদম ফোয়ারা এবং মৎস্য ভবন মোড়ে এ ঘটনা ঘটে।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করে জোট। আটটি বামদলের এই জোট ‘গণতন্ত্রের কালো দিবস’ পালন উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে।
এই জোটে রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। তাদের কর্মসূচির মধ্যে আরও ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কালো পতাকা মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে রওনা হন জোটের নেতারা। মিছিলটি কদম ফোয়ারার সামনে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যান নেতাকর্মীরা।
বেলা একটার দিকে মৎস্য ভবনের সামনে আবারও পুলিশি বাধার মুখে পড়েন নেতাকর্মীরা। তারা ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে মিছিল থেকে ইটপাটকেল ছুড়ে মারার অভিযোগ তুলে পুলিশ সদস্যরা নেতাকর্মীদের ওপর শুরু করে ব্যাপক লাঠিচার্জ। তাদের মারধর করে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন গণংসহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, আমাদের কর্মসূচিতে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এতে আমার মাথা ফেটে গেছে। অনেকে আহত হয়েছেন।
লাঠিচার্জের অভিযোগের বিষয়ে ডিএমপি রমনা জোনের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান বলেন, আমরা তাদের (বাম জোটের নেতাদের) অনুরোধ করেছিলাম যেন সহিংসতা না করে, ব্যারিকেড না ভাঙে। কিন্তু বাম জোটের নেতাকর্মীরা কথা শোনেননি। তারা প্ল্যাকার্ডের সঙ্গে থাকা লাঠি ও বাঁশ দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করে। এতে আমাদের ৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। তিনি বলেন, পুলিশ অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। পরে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়।
এর আগে সকালে প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশে বক্তব্য দেন সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি এ সময় বলেন, জনগণ সোনালি দিন রচনা করে, আর শাসকরা ক্ষমতা দখল করার পর কালো দিবস রচনা করে। আমরা বাঙালি জাতির ইতিহাস থেকে এই কালো দিবস রচনার অধ্যায় চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাই। তা করতে হলে বর্তমান সরকারকে সরাতে হবে। এই দেশকে বাঁচাতে হলে, এই সরকারের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, আজকে (গতকাল সোমবার) কালো দিবস। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের নামে যে ঘটনা ঘটেছিল তা ছিল ভুয়া নির্বাচন। ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় বসে সে সরকারও ভুয়া। তাই ভুয়া নির্বাচন বাতিলের যেমন দাবি তুলেছি, এই ভুয়া সরকারকে সরাতে আমাদের রাজপথে সংগ্রাম করতে হবে।
সেলিম আরও বলেন, শুনলাম আওয়ামী লীগ নাকি গণতন্ত্র রক্ষা দিবস পালন করছে। তারা যে বিশাল কর্মটা করেছিল তা তো ৩০ তারিখে হয়নি, ২৯ তারিখে হয়েছে। আমি নিশ্চিত আওয়ামী লীগের নেতাদের এতটুকু সততা থাকে তাহলে গণতন্ত্র রক্ষা দিবসটা ৩০ তারিখে না, ২৯ তারিখ রাতেই করে ফেলেছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব দলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা দরকার। কোনো দল বা ব্যক্তি নিজস্ব রাজনৈতিক মত প্রকাশ অধিকার রাখেন। তবে সেটা রাষ্ট্রবিরোধী বা সাংঘর্ষিক না হলেই হলো। বাম রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জ কতটা যৌক্তিক সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *