আল মামুন

যেভাবে রাষ্ট্রপতি হলেন ড. কালাম

যেভাবে রাষ্ট্রপতি হলেন ড. কালাম

আন্না ইউনিভার্সিটিতে একদিন ক্লাস নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় টেলিফোনে একটা কল এলো। অপরপ্রান্ত থেকে একজন ড. কালামকে বললেন— ‘প্রধানমন্ত্রী আপনার সাথে কথা বলতে চান।’

তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছেন এমন সময় অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু তাঁর মোবাইলে কল করে বললেন— ‘অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটা কল পাবেন, আপনি অনুগ্রহ করে নেতিবাচক জবাব দেবেন না।’

যখন নাইডুর সাথে কথা বলছিলেন তখনই প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন— ‘কালাম, আপনার একাডেমিক জীবন কেমন চলছে?’

ড. কালাম বললেন— ‘চমৎকার।’

বাজপেয়ী বলে চললেন— ‘আপনার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে। আমি এই মাত্র সমস্ত কোয়ালিশন পার্টির একটি বিশেষ সভা থেকে এসেছি। আমরা সর্ব সম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, জাতি চায় আপনি রাষ্ট্রপতি হোন। আজ রাতে এ বিষয়ে ঘোষণা দিতে যাচ্ছি। আমি আপনার সম্মতি পেতে চাই। আমি প্রত্যাশা করি আপনি এ বিষয়ে ‘হ্যা’ বলবেন, অবশ্যই ‘না’ বলবেন না।

ড. কালাম বাজপেয়ীকে তখন বললেন— ‘বাজপেয়িজী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাকে কি দুই ঘণ্টা দিতে পারবেন? রাষ্ট্রপতি পদে আমাকে মনোনয়ন দিতে সমস্ত রাজনৈতিক দলের সকলেই একমত আছে কিনা সেটাও আমার জানা প্রয়োজন।’

বাজপেয়ী বললেন— ‘আপনি রাজি থাকার পরই আমরা ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবো।’

পরবর্তী দুই ঘণ্টায় ড. কালাম তাঁর ঘনিষ্ঠবন্ধুদের কাছে অন্তত ৩০টি টেলিফোন করলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বললো— ‘তুমি শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত, ওই কাজের প্রতি নিবেদিত ও অনুরক্তও বটে। তাই তোমার কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসা উচিত হবে না।’

কেউ কেউ বললো— ‘প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব তোমার গ্রহণ করা উচিত।’

দ্বিতীয় মতামতটি ছিলো জাতি ও পার্লামেন্টের সামনে ভারতকে ২০২০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছে দেবার জন্য ড. কালামের চিন্তা চেতনাকে তুলে ধরার অপূর্ব সুযোগ। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দিবেন না।

ঠিক দুই ঘণ্টা পর তিনি বাজপেয়ীকে ফোন করলেন। বললেন— ‘বাজপেয়িজী, খুবই একটা গুরুত্বপূর্ণ মিশনের জন্য আমি এটা গ্রহণ করছি। তবে সমস্ত দলের প্রার্থী হিসাবে পদটি গ্রহণ করাটাই আমি বেশি পছন্দ করি।’

বাজপেয়ী বললেন— ‘হ্যা, আমরা এজন্য অবশ্যই কাজ করবো, আপনাকে ধন্যবাদ।’

খবরটা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়লো। ড. কালাম ভারতের রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন— এই খবরটা পনেরো মিনিটের মধ্যে সারা দেশে জানাজানি হয়ে গেলো। আর এভাবেই ড. কালাম হয়ে গেলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি।

ড. কালাম তাঁর ‘টার্নিং পয়েন্টস্’ বইয়ে লিখেছেন— ‘আমার জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার ছিলো। এটা এমন একটা প্লাটফর্ম যেখান থেকে ইনডিয়া ২০২০ মিশনকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। রাষ্ট্রপতি পদ পাবার পরিপ্রেক্ষিতে আমি এই সুযোগ লাভ করলাম। আমি সামাজিক অঙ্গনের বিশেষ করে যুবক-যুবতী ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সরাসরি যোগযোগ করতে সক্ষম হলাম।’

এই হলো ড. কালাম। যিনি ক্ষমতাকে কখনো অপব্যবহার করতে চাননি, নিজের স্বার্থে লাগাতে চাননি।

‘রাষ্ট্রপতির কাজ শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা’— এই নীতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি তাঁর এই দায়িত্বের বাইরে গিয়েও দেশের নানাক্ষেত্রে উন্নয়নের স্বার্থে নিজেকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন। দেশের জন্য অকাতরে শুধু নিজেকে সঁপে দিয়েছেন ড. কালাম। অকুতোভয় আপসহীন দেশপ্রেমিক গদির লোভে কখনো নিজেকে অল্পদামে বিকিয়ে দেননি। নিজেকে সাধারণের কাতারে দাঁড় করিয়ে সবকিছুর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। সম্ভবত এ জন্য এই নিরহংকারী মানুষটি ‘জনগণের রাষ্ট্রপতি’ হতে পেরেছিলেন।

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *