আল মামুন

ড. কালামের জীবনের চারটি স্টেজ

ড. কালামের জীবনের চারটি স্টেজ

একজন মানুষকে সারাজীবনে কয়েকটি স্টেজ বা পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। আমেরিকান দার্শনিক ড. ওয়াইন ডবিøউ ডায়ার তাঁর ‘মেনিফিস্ট ইয়োর ডেস্টিনি’ বইতে মানবজীবনকে চারটি ভাগে ভাগ করেছেন। জীবনের এই চারটি স্টেজ হলো— ‘অ্যাথলেট স্টেজ’ বা ক্রীড়াণক পর্যায়। এই স্টেজে একটি জাতি সংগ্রাম ও সংঘাত থেকে মুক্ত থাকে। এই সময়টা জাতীয় কৃতিত্ব প্রদর্শন ও সাফল্য অর্জনের সময়।

‘ওয়ারিওর স্টেজ’ বা সংগ্রামী পর্যায়। এ পর্যায়ে এসে সে জাতি অন্যদের অন্যদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে এবং দ্রæত সাফল্য অর্জনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নিজের প্রাধ্যন্য অন্যকে মেনে নিতে বাধ্য করাই এ পর্যায়ের মূল প্রতিপাদ্য হয়ে ওঠে।

এরপরই আসে ‘স্টেটস্পার্সন স্টেজ’ বা দায়িত্বপ্রধান পর্যায় বা বড়ভাইসুলভ পর্যায়। এ পর্যায়ে এসে আত্মঅহমিকা নিয়ন্ত্রণ করে একটি দেশ একটি গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিণতি লাভ করে এবং তার নেতৃত্বসূলভ আচরণকে অন্য দেশ ও সমাজের কাছে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। আর চতুর্থটি হলো— ‘স্পিরিট স্টেজ’ বা আধ্যাত্মিক তেজস্বী পর্যায়।

১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসআরও তে কাজ করেছেন ড. কালাম। ১৯৮০ সালে ভারত প্রথমবারের মত সফলভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে এবং কক্ষপথে ‘রোহিনী স্যাটেলাইট’ প্রতিস্থাপন করে বিশ্বের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ স্পেস ক্লাবের সদস্য হয়। এসএলভি-৩ এর ওই মিশনে ড. কালাম পরিচালক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর গুরু হিসেবে পেয়েছিলেন ড. বিক্রম সারাভাই, অধ্যাপক সতীশ ধাওয়ান এবং ড. ব্রহ্ম প্রকাশকে। এদের সম্পর্কে তিনি বলেন— ‘এই তিনজনের কাছ থেকে আমি নেতৃত্বের শিক্ষা পেয়েছিলাম। আমি ছিলাম শিক্ষানবীশ। আর এই সময়টাই ছিলো আমার অ্যাথলেট স্টেজ।’

ড. কালাম তাঁর জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় হিসেবে ধরেছেন ১৯৮২ সাল থেকে, যখন তিনি ডিআরডিওতে (ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন) যোগ দিয়েছিলেন। ডিআরডিওতে দুটি স্ট্র্যাটেজিক মিসাইলের ডিজাইন, এর তৈরি, পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটানো, উৎপাদন এবং উৎক্ষেপণের যাবতীয় কাজ করার সৌভাগ্য হয় তাঁর। এছাড়া এই সময়ে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র স্থাপিত হয় বঙ্গোপসাগরে।

এই পর্যায়ে এসে ড. কালামকে অনেক সফলতা ও ব্যর্থতার পথ পাড়ি দিতে হয়। তিনি বলেন— ‘ব্যর্থতা থেকে আমি শিক্ষা নিয়েছি। আবার সাহস নিয়ে সেই ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। এটি ছিলো আমার জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়, যা আমাকে ব্যর্থতা সামলানোর মত জটিল ও কঠিন শিক্ষা দিয়েছিল।’

ড. কালামের জীবনের স্টেটস্পার্সন স্টেজ শুরু হয় তিনি যখন ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রপ্রযুক্তি অর্জনের মিশনে যোগ দেন। ডিএই (ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাটমিক এনার্জি) এবং ডিআরডিও’র সাথে পার্টনারশিপ করে ও সশস্ত্র সেনাবাহিনীর প্রহরায় ভারতের নিউক্লিয়ার মিশন শুরু হয়েছিলো। পরবর্তীতে সে মিশন সফলভাবে শেষও হয়েছিল।

এই সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়াধীন টিআইএফএসি’র (টেকনোলজি ইনফরমেশন, ফোরকাস্টিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট কাউন্সিল) চেয়ারম্যান হিসেবে একটানা আট বছর কাজ করেন ড. কালাম। ২০০১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর একবার তিনি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা বেঁচে যান। তখন তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি মানবজীবনের তৃতীয় পর্যায়ের পরিপাক অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন।

এরপর ২০০১ সালের ১২ অক্টোবর ৭০ তম জন্মদিনের মাত্র তিন দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দেন ড. কালাম। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি।

জীবন সায়াহ্নের কাছাকাছি এসে তিনি ভাবতে থাকেন— ‘আমি কি মানবজীবনের চতুর্থ পর্যায়ে যেতে পারবো? আমি আদৌ সফল হতে পারবো? এর উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু একটি বিষয় আমি ভালো করেই জানি, বড় হবার স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় শক্তি স্বর্গে-মর্ত্যে আর কোথাও নেই। স্বপ্ন হলো এমন এক অমিত শক্তির আধার যা হৃদয়ে ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বস্তু জগৎ ও আধ্যাত্মিক জগত সক্রিয় হয়ে ওঠে।’

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *