আল মামুন

ভার‍তের নাগরিকত্ব আইন : বাংলাদেশের জন্য সতর্ক সংকেত

ভার‍তের নাগরিকত্ব আইন : বাংলাদেশের জন্য সতর্ক সংকেত

আল মামুন
নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতা করে ভারতে চলছে তীব্র বিক্ষোভ, জ্বালাও-পোড়াও। দেশটির কয়েকটি রাজ্যে বাস-ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে অন্য রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বাইরেও।
নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ভারত জুড়ে চলমান আন্দোলন বিজেপি সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি তাদের।
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, কেরালা, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, দিল্লিসহ প্রায় গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন থামাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। চলমান বিক্ষোভে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে, গ্রেপ্তার করেও আন্দোলনকারীদের দমাতে পারছে না পুলিশ।
আইনের মাধ্যমে মোদী সরকার চাইছে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, পার্সি ও খ্রিষ্টানধর্মীদের সহজভাবে নাগরিকত্ব দেওয়া আর মুসলমানদের বিতাড়িত করা।
প্রতিবেশি দেশ থেকে যাওয়া হিন্দুদের সে দেশে নাগরিকত্ব দেওয়াকে অনেকেই দেখছেন মোদী সরকারের ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ তৈরির নীলনকশা হিসেবে। ভারত সাংবিধানিকভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ হওয়ায়, বিজেপির এমন সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক বলছেন প্রতিবাদকারীরা।
প্রতিবাদকারীরা নাগরিকত্ব আইনকে মুসলিমবিরোধী বলে উল্লেখ করে এলেও, বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে উল্টো কথা। বিজেপি বারবারই বলছে, এই আইন ভারতের মুসলমানদের কোনো ক্ষতির কারণ হবে না।
ইতিমধ্যে এই আইনটি পাশ হওয়ার পর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চলমান গণ-বিক্ষোভ দমন করার জন্য এর মধ্যে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং স্থগিত করা হয়েছে ইন্টারনেট সেবা। মারা গেছে ত্রিশেরও অধিক মানুষ।
আইনটি পাশ হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষরা প্রশ্ন তুলেছে, আসলেই কি সদ্য পাশ হওয়া আইনের অন্তর্নিহিত সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই এই প্রতিবাদ? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ? সম্প্রতি পাশ হওয়া আইনটি আসলেই বা কি?
বিক্ষোভকারীদের শঙ্কা, এই নতুন আইনের ফলে বহিরাগতদের চাপে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বিলীন হয়ে যাবে।
নাগরিকত্ব আইন পাশ হওয়ার পরে দেশজুড়ে প্রতিবাদের মুখে পড়েছে মোদী সরকার। গোটা দেশেই বুদ্ধিজীবীরা এর প্রতিবাদ করছেন নানাভাবে।
এরইমধ্যে আইনটির বৈধতা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় সরকারকে নোটিশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আগামী ২২ জানুয়ারি এ বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন বিষয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক হওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে। কূটনীতিকরা মনে করছেন, আইনটি পাশ হওয়ার ফলে দেশটি একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দিকে যাচ্ছে। কট্টর হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি মূলত ভোটের রাজনীতির জন্য ধর্মকে ব্যবহার করছে। যার ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো অস্বস্থিতে পড়েছে।
আইনটি পাশ হওয়ায় বাংলাদেশকে এখন অনেক সতর্ক থাকতে হবে। জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) পর ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বাংলাদেশের জন্য নতুন ধরণের সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আইনটির ফলে একদিকে যেমন বাংলাভাষীদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে কেউ এ দেশে স্থিতিশীলতা হুমকির মধ্য ফেলার সুযোগ নিতে পারে।
গোটা ভারতে চলমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন একটি জাতীয় দৈনিকের নিবন্ধে বলেছেন, ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইন বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভারতে গিয়ে বসবাসের প্রবণতা তৈরি করতে পারে। তারা মনে করতে পারে তারা হিন্দু রাষ্ট্রেই ভালো থাকবে। আবার ভারতে বসবাসরত বাংলাভাষী মুসলমানরা ভারত ত্যাগের জন্য নিপীড়নের মুখে পড়তে পারেন।
এ অবস্থায় বাংলাদেশকে অনেক সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি। সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বিজেপির এই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য একটি খারাপ সময় ডেকে আনছে। এই সময়ে বাংলাদেশকে অনেক সতর্ক থাকতে হবে। সাবধানে থাকতে হবে।
ভারতের নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব আইন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। নতুন এ আইন নিয়ে দেশবাসী উদ্বিগ্ন। এই আইন উপমহাদেশে সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে। এই আইন সাম্প্রদায়িক আইন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *