আল মামুন

জাগতে বলতেন দেশের মানুষদের

জাগতে বলতেন দেশের মানুষদের

নিজের দেশ, জন্মভূমি— একে সবাই ভালোবাসবেন, সব কিছু উজাড় করে দিবেন, এটাই তো স্বভাবিক। ড. কালামও দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। সব সময় স্বপ্ন দেখতেন দেশকে এগিয়ে নেওয়ার। ভারতকে কীভাবে বিশ্বসভায় নিয়ে যাওয়া যায়— সেই চেষ্টাই তিনি করেছেন সারাজীবন। তিনি সব সময় দেশের জনগণকে জেগে উঠতে বলতেন। তিনি ভারতবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ছিলেন তারা যেনো তাদের সর্বোচ্চ শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দেশকে যেনো বিশ্বের বুকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ড. কালাম বলতেন— ‘কোন শক্তি একটি জাতির উত্থান ঘটায় আর কোন বিষয়গুলো একটি দেশকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলে এটা আমাদের ভাবতে হবে।’ একটি জনগোষ্ঠি অথবা জাতিকে উন্নতির শীর্ষ চূড়ায় আরোহন করতে হলে অবশ্যই তাদের অতীতের মহান নায়কদের মনে রাখা সেই সাথে অতীতের গৌরবময় আন্দোলন ও বিজয়কে মনে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করতেন তিনি।

উন্নত ভারত গড়ে তোলার জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে ড. কালাম বলেছিলেন— ‘তোমাদের হৃদয়কে উচ্চাকাঙ্খার আগুনে প্রজ্জ্বলিত করো। বড় বড় স্বপ্ন দেখো, বৃহৎ চিন্তায় নিজেকে সমর্পণ করো।’

পৃথিবীতে যত জাতিই উন্নতি করেছে তাদের সবাই একটি লক্ষ্যে সব সময় সচেতন থেকেছে। জাপানের মত জার্মানীরাও তাদের লক্ষ্যে অবিচল ছিলো। মাত্র তিন দশকের মধ্যে জার্মানি দু’দুবার ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু জার্মানদের উন্নতির লক্ষ্যে থেকে তারা সরে আসেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভস্মাবশেষ থেকে জার্মানি আবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিশালী দেশ হিসেবে উত্থিত হয়েছে। জার্মানি যদি এত বিপদ কাটিয়ে উন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে তাহলে ভারত পারবে না কেনো?’— প্রশ্ন ড. কালামের।

ভারতকে তিনি দুর্ভাগা বলেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন— ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শক্তি ভারতবাসীকে অতীত সহ¯্রাব্দের গৌরবময় ইতিহাসকে তুলে আনবার মত সুযোগ সন্ধানী চেতনা দেয়নি। তাদের ভেতরে ঐতিহাসিক চেতনা কেন্দ্রীভূত করার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচেষ্টা করা হয়নি।

স্বাধীন ভারত প্রসঙ্গে ড. কালাম বলেছেন— ‘স্বাধীনতা কেউ এসে আমাদের উপহার দিয়ে যায়নি। সমগ্র জাতি যুগের পর যুগ সংগ্রাম করে এ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এ স্বাধীনতা রক্ষার দায় আমাদের সবার। এদেশের প্রতিরক্ষা ও উন্নয়নের চেয়ে বড় কোন মতাদর্শ নেই। জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার চেয়ে বড় কোনো ইস্যু জীবনে থাকতে পারে না।’

তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেন— ‘ব্রিটিশ জাতি যদি উন্নতির চরম শিখরে উঠে থাকে তাহলে তা সম্ভব হয়েছে লর্ড নেলসন অথবা ডিউক অব ওয়েলিংটনের মত নেতাদের গৌরবমময় সাফল্য ধরে রাখার আকাঙ্খার কারণে। জাতীয়তাবোধের দৃষ্টান্ত দিতে গেলে জাপানের নাম এক নম্বরে উঠে আসে। জাপানীরা এক মানুষ, একদেশ এবং এক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী একটি জাতি। শুধু এই জাতীয়তাবোধের কারণে তারা একটি চরম অপমানজনক সামরিক পরাজয়কে আজ অর্থনৈতিক বিজয় হিসেবে রূপ দিতে পেরেছে।’

হাইস্কুল থেকে জীবনের শেষাবধি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ধর্মের মৌলিক বিষয় পড়েছেন ড. কালাম। এর মাধ্যমে তিনি একটা বিষয় বুঝতে পেরেছেন যে, যে কোনো ধর্মেরই মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো মানুষের আত্মিক উন্নয়ন সাধন করা।
ড. কালাম বলেন— ‘আমাদের বুঝতে হবে আমাদের আধ্যাত্মিক চেতনা থেকেই ভারতে ধর্ম নিরপেক্ষতার ভিত্তি গড়তে হবে। কারণ জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় চেতনা জাগ্রত করা প্রয়োজন।’

এ জন্য ধর্মের সমন্বিত ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা দিয়ে ধর্ম দিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষ এক একতাবদ্ধ সমাজ গড়ার প্রতি জোর দিয়েছেন তিনি। ড. কালাম বলেন— ‘আমরা যদি অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্যকে ধারণ না ইতিহাসের দিকে না তাকাই, যদি অনিবার্য সাফল্যেও বিশ্বাস নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে না তাকাই তাহলে হতাশা, দুঃখ, অভাব আর নৈরাশ্য ছাড়া আমাদের জন্য আর কি অপেক্ষা করতে পারে?’

তিনি মনে করতেন— ‘উন্নত ভারতের লক্ষ্য শহরে শহরে এ দেশটা ছেয়ে ফেলা নয়। বরং প্রযুক্তিকেন্দ্রিক টেলিমেডিসিন, টেলিএডুকেশন আর ই-কমার্স চালুর মাধ্যমে এ গ্রামগুলোকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসা যায়।’

কৃষিবিজ্ঞান, শিল্পোন্নয়ন এবং জৈববিজ্ঞানের সমন্বয় থেকে নতুন ভারতের উদ্ভব হবে। সে ভারতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই চেতনা ধারণ করে তাদের কাজ করবে যে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ অনেক বড়। এতে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য হ্রাস পাবে। গ্রামে আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তি সুবিধা পৌছে গেলে শহরপ্রিয় মানুষও গ্রামের উন্নত দ্রব্য সাগ্রীর জন্য গ্রামের দিকে মনোযোগী হবে।

দেশকে গিয়ে এমন অনেক পরিকল্পনার কথা, অনেক স্বপ্নে কথা বলেছেন ড. কালাম। তিনি সব সময়ই ভারতেকে একটি শিক্ষিত এবং দারিদ্রমুক্ত জাতি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন দেশ পরিচালনায় থাকবেন আদর্শ নেতারা। কালাম বলেন— আমি এমন এক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি যেখানে বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে সাধারণ মানুষের মঙ্গলার্থে।

২০১১ সালে তিনি তরুণদের নিয়ে ‘হোয়াট ক্যান আই গিভ মুভমেন্ট’ শীর্ষক দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *