আল মামুন

বিজ্ঞানী ও জ্ঞানসাধক

বিজ্ঞানী ও জ্ঞানসাধক

ড. কালামের বাবা তাঁকে বানাতে চেয়েছিলেন কালেক্টর আর তিনি হয়ে গেলেন রকেট ইঞ্জিনিয়ার। অবশ্য রকেট ইঞ্জিনিয়ারও তাঁর হওয়ার ইচ্ছা ছিলো না, তিনি হতে চেয়েছিলেন বৈমানিক; যুদ্ধবিমানের পাইলট। ছোটবেলায় তাঁর শিক্ষক শিব সুব্রামনিয়াম আয়ার একবার শ্রেণিকক্ষের বোর্ডে একটি পাখি এঁকে পাখিটি দেখিয়ে বলেছিলেন— ‘পাখির মতো উড়তে পারবে?’ বিষয়টি তার ছোট মনে বেশ নাড়া দিয়েছিল। তখন তিনি পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি, তিনি বিমানের বিমান প্রকৌশলে পড়াশোনা করে পাইলট হতে পারেননি। তবে তিনি দমেও যাননি। পরবর্তী সময়ে বিমান প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করে হয়েছিলেন রকেটবিজ্ঞানী। ভারতের প্রথম মহাকাশযান তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন ড. কালাম।

তিনি বলেন— ‘বিমান চালনাবিদ্যা একটি আকর্ষণীয় বিষয় যার ভেতর রয়েছে মুক্তির প্রতিশ্রুতি। মুক্তি ও পলায়ন, গতি ও স্থানান্তর, গড়িয়ে যাওয়া ও প্রবাহিত হওয়ার মধ্যে যে পার্থক্য তা বিজ্ঞানের গূঢ় রহস্য। আমার শিক্ষকরা আমার কাছে এসব সত্য উন্মোচন করেছেন। তারা যত্নের সঙ্গে যা শিখিয়েছেন তা বিমান চালনাবিদ্যা সম্পর্কে আমার মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।’

ভারতের মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের পুরোভাগে ড. কালামের নাম। প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানী হিসেবে ভারতে ব্যাপকভাবে সমাদৃত তিনি। ভারতের প্রতিরক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির প্রধান ব্যক্তি হিসেবে তিনি যে উদ্ভাবনী শক্তির প্রতাশ ঘটিয়েছেন তা সে দেশের মৃতপ্রায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। অগ্নি, পৃথ্বি, আকাশ, ত্রিশূল, নাগ— এসব নামের ক্ষেপণাস্ত্র আজ ভারতের ঘরে ঘরে পরিচিত। শুধু ভারতে নয়— গোটা বিশ্ববাসীর কাছেই পরিচিত। এগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ড. কালাম নাসায় প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে আসার পরপরই ১৯৬৩ সালের ২১ নভেম্বর ভারতের প্রথম রকেট উৎক্ষেপিত হয়। এটি ছিলো নাইকি-আপাচি নামে একটি সাউন্ডিং রকেট, যা নাসারাই তৈরি। রকেটটি উৎক্ষেপণকালে এর সামঞ্জস্য রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন ড. কালাম। রকেট উৎক্ষেপণে তার দুই সহকর্মী ছিলেন— ড. ঈশ্বর দাস এবং আর. অরাভামুডান। এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তারুণ্যের শক্তি উপলব্দি করে এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রজ্ঞাকে সম্বল করে ড. কালাম তাঁর প্রযুক্তি কেন্দ্রীক উন্নয়ন পরিকল্পনায় হাত দিয়েছিলেন। যেখানে মানুষ নতুন নতুন বাধা অতিক্রম করবে নতুন নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে। সেখানে তারা বুঝতে চেষ্টা করবে কঠিন সমস্যা উৎরে কীভাবে সফলতার পথে আসতে হয়।

ভারতের প্রথম মহাকাশ যান এসএলভি-৩ তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখেন ড. কালাম। ওই মহাকাশ যান দিয়েই ১৯৮০ সালে ভারত প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ‘রোহিনী’ উৎক্ষেপণ করে। ভারতের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনা (স্ট্র্যাটেজিক মিসাইল সিস্টেমস) এবং ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষায়ও প্রধান ভূমিকা রাখেন এই বিজ্ঞানী।

পদার্থবিজ্ঞান ও বিমান প্রকৌশলবিদ্যা সম্বন্ধে অধ্যয়ন করে তিনি পরবর্তী চল্লিশ বছর রক্ষা অনুসন্ধান এবং বিকাশ সংগঠন এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভারতের অন্তরীক্ষ কর্মসূচি ও সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত তাঁর গবেষণার কারণে তাঁকে ভারতের ‘ক্ষেপনাস্ত্র মানব’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ড. কালাম ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত ভারতের পোখরান-২ ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষার ব্যাপারেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

একজন অখ্যাত ব্যক্তি থেকে ড. কালামের উত্থান একজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে। ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা হিসেবে তাঁর ভূমিকা শান্তির পরিপন্থী— এ কথা বলে অনেকে সমালোচনাও করেছেন। তবে সেসব সমালোচনা ধোপে টেকেনি। ড. কালাম তাঁর মেধা-সাধনা দিয়ে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছেন ভারতকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে, চেষ্টা করেছেন দেশকে এগিয়ে নিতে।

বিজ্ঞানী হিসেবে ভারতে তাঁর অবদান অসামান্য। তাঁর হাত ধরেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছে ভারতের মহাকাশ গবেষণা। ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অরগানাইজেশনে তার অবদান অনেক। ভারতের রকেট ও মিসাইল প্রযুক্তিতে তাঁর অবদান সর্বাগ্রে।

বিজ্ঞানী না রাষ্ট্রপতি— কোন পরিচয়ে পরিচিত হতে পছন্দ করেন? একবার এক শিক্ষার্থীর এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কালাম শুধুই হাসলেন। তারপর প্রশ্নকর্তা শিক্ষার্থীকে বললেন— ‘এটা তোমরাই বলতে পারবে। ওই শিক্ষার্থী ঝটপট বলে ওঠেন— ‘আপনি একজন ‘বৈজ্ঞানিক রাষ্ট্রপতি’।’ শিক্ষার্থীর এমন জবাব পেয়ে বাচ্চাদের মতো হাসলেন। সবার উদ্দেশে বললেন— ‘হাসতে হবে প্রাণ খুলে। হাসতে পারাটা খুব দরকার। হাসি জীবনকে সহজ করে। কঠিন সময় পার করতে সহায়তা করে।’

নিজে বিখ্যাত বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও তার ভেতরে এতোটুকুন দাম্ভিকতা স্থান পায়নি। তিনি সব সবসময়ই বিনয়ী থেকেছেন। এবং জীবনের সবক্ষেত্রে যাদের সাহচর্য পেয়েছেন বা যাদের সান্নিধ্যে থেকে শিখেছেন সব সময় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করেছেন।

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *