আল মামুন

মা-বাবা যার আদর্শ

মা-বাবা যার আদর্শ

ড. কালাম তারঁ মা-বাবার প্রতি সব সমময়ই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। জীবনের সব ক্ষেত্রে তাদেরকে আদর্শ মনে করতেন। তিনি তাঁর জীবনীগ্রন্থে বলেন— ‘আব্বার কাছ থেকে আমি পারিপার্শিক অস্থিরতার মধ্যে মনকে প্রশান্ত রাখার বিষয়টি শিখেছি। বহু দুঃখ ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েও নিজেকে পরাজিত হিসেবে বিবেচনা করিনি।’ বালক বয়সে বাবার কাছ থেকে সততার যে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তা তাঁর জীবনে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়।

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ড. কালামের পরিবার থাকতো রামেশ্বরম শহরে। ওই সময়টাতে তাঁদের পরিবার বেশ কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছিলো। ড. কালামের বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। যুদ্ধের প্রভাবে রামেশ্বরমে খাবার থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য পণ্যসহ সবকিছুর দারুণ সংকট। তাঁর মা-বাবা সব ভাই বোন, তাদের মধ্যে তিনজনের আবার নিজেদেরও পরিবার আছে, সব মিলিয়ে এক এলাহি কাণ্ড। তাঁর দাদি ও মা মিলে সুখে-দুঃখে এই বিশাল সংসার সামলে রেখেছেন তখন।

প্রতিদিন ভোর চারটায় ড. কালামক তাঁর মা ঘুম থেকে ওঠাতেন। তিনি ঘুম থেকে উঠে অঙ্ক শিক্ষকের কাছে যেতেন। শিক্ষক তাঁকে পড়াতেন বিনা পারিশ্রমিকে। তাঁর মা আশিয়াম্মা ঘুম থেকে উঠতেন তাঁরও আগে। তিনি তাঁকে গোসল করিয়ে, তৈরি করিয়ে তারপর পড়তে পাঠাতেন। পড়া শেষে সাড়ে পাঁচটার দিকে বাড়ি ফিরতেন। তারপর তিন কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনে যেতেন খবরের কাগজ আনতে। যুদ্ধের সময় বলে স্টেশনে ট্রেন থামত না, চলন্ত ট্রেন থেকে খবরের কাগজের বান্ডিল ছুড়ে ফেলা হত প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন থেকে ছুড়ে ফেলা সেই কাগজের বান্ডিল নিয়ে সারা শহরে ফেরি করা, সবার আগে গ্রাহকের হাতে খবরের কাগজ পৌঁছে দেওয়াই ছিলো ড. কালামের কাজ।

কাগজ বিক্রি শেষে সকাল আটটায় ঘরে ফিরলে মা নাশতা খেতে দিতেন। অন্যদের চেয়ে তাঁকে একটু বেশিই কতে দিতেন, কারণ তিনি একই সঙ্গে পড়া আর কাজ—দুটোই করতেন। সন্ধ্যাবেলা স্কুল শেষ করে আবার শহরে যেতেন লোকজনের কাছ থেকে বকেয়া আদায় করতে। সেই বয়সে তাঁর দিন কাটত শহরময় হেঁটে, দৌঁড়ে আর পড়াশোনা করে। একদিন সব ভাইবোন মিলে খাওয়ার সময় মা তাঁকে রুটি তুলে দিচ্ছিলেন, তিনিও একটা একটা করে খেয়ে যাচ্ছিলেন। খাওয়া শেষে বড় ভাই তাঁকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বললেন— ‘কালাম, কী হচ্ছে এসব? তুমি খেয়েই চলছিলে, মাও তোমাকে তুলে দিচ্ছিল। তাঁর নিজের জন্য রাখা সব কটি রুটিও তোমাকে তুলে দিয়েছে। এখন অভাবের সময়, একটু দায়িত্বশীল হতে শেখো। মাকে উপোস করিয়ে রেখো না।’ শুনে ড. কালামের শিরদাঁড়া পর্যন্ত শিউরে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন।

মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়লেও পরিবারে ছোট ছেলে হিসেবে পরিবারে তাঁর একটা বিশেষ স্থান ছিলো। তাঁদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। কেরোসিন দিয়ে বাতি জ্বালানো হতো; তাও শুধু সন্ধ্যা সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত। মা ড. কালামকে কেরোসিনের ছোট্ট একটা বাতি দিয়েছিলেন, যাতে তিনি অন্তত রাত ১১টা পর্যন্ত পড়তে পারেন। ড. কালাম বলেন— ‘আমার চোখে এখনো পূর্ণিমার আলোয় মায়ের মুখ ভাসে। আমার মা ৯৩ বছর বেঁচে ছিলেন। ভালোবাসা আর দয়ার এক স্বর্গীয় প্রতিমূর্তি ছিলেন আমার মা।’

একবার এক অনুষ্ঠানে এক শিক্ষার্থী নারীকে কীভাবে দেখেন— এমন প্রশ্ন করলে জবাবে ড. কালাম বলেন— ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণাদাত্রী আমার মা।’ তিনি এও বলেন— ‘আমি চাই, নারীর আরও ক্ষমতায়ন হোক। ভারতের পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আরও অধিক সংখ্যায় নারীর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কারণ, নারীরা পিছিয়ে থাকলে দেশ এবং দেশের উন্নয়নই পিছিয়ে থাকবে।’

রামেশ্বরম দ্বীপে বেড়ে ওঠা ড. কালামের জন্য বই পড়া, বই সংগ্রহ করা ছিল অনেকটাই দুষ্কর। তারপরেও সেই ছোট বেলায় তার বাবার আধ্যাত্মিক তত্ত্ব তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে প্রত্যাশার উঁচু প্রাচীরে, যা এক সময়ে তাঁকে তুলে ধরে সাফল্যে স্বর্ণ মন্দিরে।

তাঁর বাবা জয়নুল আবেদিনের আধ্যাত্মিক তত্ত্বের এক উপলব্ধি লিখতে গিয়ে ড. কালাম বলেছেন— ‘প্রত্যেকটি মানুষ তার নিজের কালে নিজের স্থানে যা হয়েছে, যে অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে সমগ্র ঐশ্বরিক সত্তার এক বিশিষ্ট অংশ। তাই বাধা-বিঘ্ন, দুঃখ কষ্ট, সমস্যা এলে ভয় পাবে কেন? দুঃখ কষ্ট এলে তোমার দুঃখ কষ্ট বোঝার প্রয়োজনীয়তা বুঝার চেষ্টা করো। দুঃসময় এলেই সুযোগ আসে আত্মসমীক্ষার।

সত্যিই দারুণ এক উপলব্ধি শিখিয়েছিলেন কালামের বাবা। তাই হয়ত, সকল দুঃখ কষ্টকে জয় করেই বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হওয়ার বিজয় মুকুটে তাঁকেই মানিয়েছিল।

ড. কালাম তাঁর বালক বয়সে তাঁর মা-বাবার কাছ থেকে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার শিক্ষা পেয়েছিলেন। শিখেছিলেন সহনশীল হতে। মা-বাবার কাছ থেকে সততার যে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তা তাঁর জীবনে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। তিনি সততার দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে লোভ লালসাহীন অনাড়ম্বর জীবনযাপনে ব্রতী থেকেছেন সারা জীবন।

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *