September 21, 2020

সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস

সৃষ্টিকর্তার প্রতি ড. কালামের ছিলো অগাধ বিশ্বাস। তিনি তাঁর জীবনের সফলতার জন্য সব সময়ই সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাঁর লেখা বইগুলোতে সে সবের প্রমাণ মেলে। তিনি তাঁর বাবার সাথে এলাকার মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন এবং রমজান মাসে রোজাও রাখতেন।

ড. কালাম তাঁর ‘উইংগস অফ ফায়ার’ বইয়ে লেখেন— ‘আল্লাহ এই চমৎকার গ্রহের প্রতিটি বস্তুই একটি বিশেষ ভূমিকা পালনের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আমি আমার জীবনের যে সাফল্য অর্জন করেছি তা তারই (সৃষ্টিকর্তা) সাহায্যে এবং এটি তার ইচ্ছারই একটি প্রকাশ। তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষক ও সহকর্মীর মাধ্যমে আমাকে তাঁর অনুগ্রহ দিয়েছেন। যখন আমি এই চমৎকার মানুষগুলোর প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করি তখন আমি কেবল সৃষ্টিকর্তার মহিমারই প্রশংসা করি। এসব রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ড. কালাম নামের একজন সামান্য ব্যক্তির মাধ্যমেই তারই (সৃষ্টিকর্তার) সৃষ্টি, যার উদ্দেশ্য ভারতের কোটি কোটি মানুষকে এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে তাঁরা যেনো কখনো অসহায়বোধ না করেন।’

এ সহজ সরল বোধ থেকে ড. কালামের আত্মোপলব্ধি— ‘জীবনে যা কিছু অর্জন করেছেন তা পরম সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে। তাঁর (নিজের) মাধ্যমে এসব সৃষ্টিকর্তারই কীর্তির বহিঃপ্রকাশ।’

তিনি আরো বলেন— ‘আমরা প্রত্যেকই সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত একটি আগুন নিয়ে জন্মগ্রহণ করি। আমাদের প্রচেষ্টা হওয়া উচিত এই আগুনকে ডানা মেলে দেওয়া এবং বিশ্বকে এর মঙ্গলের দীপ্তি নিয়ে পূর্ণ করা।’

ড. কালামের একজন তরুণ সহকর্মী ছিলেন অরুণ তিওয়ারী। তাঁর স্মৃতিচারণ লিখে রাখতেন এই সহকর্মী। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি ড. কালামের সঙ্গে কাজ করছিলেন। ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অরুণ একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হায়দারাবাদে নিজামস্ ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সের ইনটেনসিভ করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করাতে হয়। ৩২ বছর বয়সী অরুণ সাহসের সঙ্গেই তার রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। একদিন তাকে হাসপাতালে দেখতে গেলেন ড. কালাম। তিনি অরুণের কাছে জানতে চাইলেন তার জন্য তিনি কিছু করতে পারেন কিনা। তখন অরুণ বললেন— ‘আমাকে আপনার আশীর্বাদ দিন, স্যার, যাতে আমি দীর্ঘায়ু হতে পারি এবং কমপক্ষে আপনার একটি প্রকল্প শেষ করতে পারি।’

অরুণের এই মনোভাব ড. কালামের মনকে নাড়া দেয়। এরপর তিনি বাসায় ফিরে সারারাত ধরে প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন— ‘আমি অরুণের জন্য সারারাত সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি। সৃষ্টিকর্তা আমার প্রার্থনা শোনেন এবং অরুণ এক মাসের মধ্যে তার কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে সক্ষম হয়।’

তিন বছরের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র ‘আকাশে’র পূর্ণাঙ্গ কাঠামো বাস্তবে রূপ দেওয়ার কাজে সহায়তাকারী হিসেবে অরুণ চমৎকারভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। শেষ বছরে তিনি ধৈর্যের সঙ্গে পুঙ্খানুপঙ্খভাবে ড. কালামের স্মৃতিচারণ লিপিবদ্ধ করেন এবং সাবলীল বাষায় তা বর্ণনা করেন।

সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাসের আরো প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর লেখা ‘ইগনাইটেড মাইন্ডস’ বইয়েও। সেখানে ‘শয়তানের বিষদৃষ্টি’ থেকে দেশকে রক্ষার জন্য তাঁকে প্রার্থনা করতে দেখা গেছে। তিনি প্রার্থনা করেছেন— ‘হে পরম করুণাময়, তুমি আমার দেশের মানুষকে কর্মঠ করে তোলো। তুমি আমাদের আরো অসংখ্য ‘অগ্নি’ তৈরির সক্ষমতা দাও, যাতে আমরা শয়তানের বিষদৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারি।’

অন্যত্র তিনি বলেন— ‘হে আল্লাহ! আমার জনগণকে তুমি সম্প্রীতির বন্ধনে পরস্পরের সাথে বেঁধে দাও। ভারতের একটা ধুলিকনা হয়ে আমাকে গর্ব করার সুযোগ দাও, যে ধুলিকণা আবার জেগে উঠবে। পূর্ণ স্বাধীনতায় আবার যে উড়ে বেড়াতে পারবে।’ ড. কালাম তাঁর শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্খীদের সুস্বাস্থ্য কামনা করেও প্রার্থনা করতেন— ‘হে সর্ব শক্তিমান, আমার দেশের মানুষের মনে সৃজনশীলতা ও কর্মস্পৃহা দাও, যাতে তারা একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে।’

বিভাজন ও ভেদাভেদের বিরুদ্ধে জনগণকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য দেশের ধর্মীয় নেতাদের সাহায্য কামনা করেও তিনি প্রার্থনা করেছেন— ‘হে সর্ব শক্তিমান, আমাদের জননেতাদের মনে এই মন্ত্র গেঁথে দাও— ব্যক্তির চেয়ে দেশ অনেক বড়। হে আল্লাহ! আমার দেশের মানুষের কাজের ওপর রহমত বর্ষণ করো আর এ দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করো।’ এ কথার দ্বারা শুধু সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাসেরই প্রমাণ মেলে না, প্রমাণ মেলে প্রবল দেশপ্রেমেরও।

ড. কালাম মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠলেও অন্যান্য ধর্মের মানুষের সাথে ছিলো তাঁর সমান মেলামেলা। তিনি সবাইকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখতেন। সব ধর্মের ধর্মগ্রন্থই তিনি পড়তেন। তাঁর জীবনে পড়া শ্রেষ্ঠ ৪টি বইয়ের মধ্যে কোরআন অন্যতম— আত্মজীবনীতে সে কথাও উল্লেখ করেছেন।

একবার এক অনুষ্ঠানে এক শিক্ষার্থী তাঁর ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে তিনি বলেন— ‘যারা মহৎ তারা ধর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের মঙ্গলে কাজ করে। আর যারা খারাপ, তারা ধর্মকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।’ তিনি ধর্মের কাছ থেকে ভালো শিক্ষা নিয়ে তা জাতির উন্নয়নে কাজে লাগাতে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানান।

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *