আল মামুন

বোনের গহনা বন্ধক রেখে এমআইটিতে ভর্তি

বোনের গহনা বন্ধক রেখে এমআইটিতে ভর্তি

সাফল্য অর্জনের ব্যাপারে সব সময়ই ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ড. কালাম। এ জন্য তিনি উচ্চশিক্ষা নিতে চাইলেন। এবং এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি মোটেই দেরি করেননি। সে সময় পেশাগত শিক্ষা সম্পর্কে কোনো সচেতনতা ছিলো না। তখন উচ্চশিক্ষা বলতে সাধারণত কলেজে ভর্তি হওয়াকে বোঝাত। ড. কালামের বাড়ি থেকে সবচেয়ে কাছের কলেজটি ছিলো তিরুচরিতাপল্লীতে। একে সবাই উচ্চারণ করতো ত্রিচিনোপালি, সংক্ষেপে ত্রিচি।

শোয়ার্জ স্কুলের পড়া শেষে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ালেখার জন্য ১৯৫০ সালে ত্রিচির সেন্ট জোসেফস কলেজে ভর্তি হলেন ড. কালাম। সৌভাগ্যবশত রেভারেন্ড ফাদার টি এন সিকুয়েইরার নামে একজন ইংরেজির শিক্ষককে পেয়েছিলেন তিনি। রেভারেন্ড ফাদারের কর্মশক্তি আর ধৈর্য ছিলো বিস্ময়কর। তিনি তাঁর অধিকাংশ সময় ছাত্রদের দেখাশোনার পেছনে ব্যয় করতেন।

সেন্ট জোসেফস কলেজে চার বছর ছিলেন ড. কালাম। কলেজের হোস্টেলে তার দুজন রুমমেট ছিলো। এদের একজন শ্রীরঙ্গমের অন্যজন কেরালা থেকে থেকে আসা একজন সিরীয় খ্রিস্টান। তাদের তিনজনের সঙ্গে চমৎকার সময় কেটেছে হোস্টেলে।

ড. কালাম জোসেফসে যখন শেষ বর্ষের ছাত্র তখন তিনি ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি ধ্রুপদি সাহিত্যগুলো পড়া শুরু করেন। এরপর দর্শনের ওপর কিছু লেখা পড়েন। এ সময় আগ্রহী হয়ে ওঠেন পদার্থ বিজ্ঞানেও। এরপর পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে যোগ দেন বিএসসি কোর্সে। পরমাণুর চেয়ে ক্ষুদ্রতম কণা বিষয়ক পদার্থজ্ঞিান পাঠদানকালে শিক্ষক প্রফেসর চিন্না দুরাই ও প্রফেসর কৃষ্ণমূর্তি পদার্থের তেজষ্ক্রিয় ক্ষয়প্রাপ্তি সংক্রান্ত বিষয়বস্তুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

এরপর বিএসসি ডিগ্রি লাভের পরই ড. কালাম বুঝতে পারেন পদার্থবিজ্ঞান তার বিষয় নয়। তিনি এবার সিদ্ধান্ত নিলেন— ‘আমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাকে প্রকৌশল বিষয়ে শিক্ষা নিতে হবে।’

সে সময়ে দক্ষিণ ভারতে কারিগরি শিক্ষার সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত ছিলো মাদ্রাজ ইনস্টিউিট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)। তিনি এমআইটিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসে। কিন্তু এখানে ভর্তি হওয়া অনেক ব্যয়বহুল ছিলো। প্রায় এক হাজার রূপি প্রয়োজন, যা তার বাবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিলো না। ঠিক এমন সময়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান তাঁর বোন জোহরা। তিনি তাঁর স্বর্ণের বালা আর চেন বন্ধক রেখে ড. কালামাকে ভর্তি করিয়ে দেন এমআইটিতে।

ড. কালাম তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেন— ‘আমাকে শিক্ষিত হিসেবে দেখতে পাওয়ার জন্য তাঁর (বোনের) এই দৃঢ়সংকল্প এবং সামর্থ্যের ব্যাপারে তাঁর আস্থা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।’ এরপর ড. কালাম তাঁর বোনের বন্ধকি দেওয়া বালা এবং চেন একদিন ছাড়িয়ে আনার অঙ্গীকার করেন।

এমআইটিতে পড়ার সময় হোস্টেলে থাকতেন ড. কালাম। তিনি যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, তখনকার ঘটনা, এক গ্রীষ্মে তাঁদের গ্রামের বাড়ি রামেশ্বরমে তুমুল ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক বাড়িঘর ভেঙে যায়। তাঁর বাবা-মা থাকেন সেখানে, তাঁদের কোনও বিপদ হয়েছে কি না সেই উদ্বেগে কালাম তখনই বাড়ি যেতে চাইলেন। কিন্তু হাতে একেবারে টাকা-পয়সা নেই। গাড়ি ভাড়াই বা জোটাবেন কোথা থেকে? মাথায় হঠাৎ এক বুদ্ধি এলো। সোজা চলে গেলেন মার্কেটে। সেখানে একটা দোকানে নতুন ও পুরনো বই কেনাবেচা হয়। সে দোকানে এসে তিনি একখানা বই বিক্রি করার চেষ্টা করলেন। বইটির নাম ‘দ্য থিয়োরি অব ইলাসটিসিটি’। সে বছরই এয়ারোডাইনামিং-এর পরীক্ষায় তিনি রেকর্ড নম্বর পেয়েছিলেন বলে এমআইটি’র অধ্যক্ষ তাঁকে বইটি উপহার দিয়েছেন। দামি বই, সেই পঞ্চাশের দশকেই চারশো টাকা। ড. কালামের রামেশ্বরম যেতে ষাট টাকা লাগবে, তা পেলেই তিনি বইটি বিক্রি করে দিতে রাজি। দোকানের মালিক মাথায় টিকিওয়ালা এক প্রৌঢ় ব্রাহ্মণ। তিনি বইটি নেড়েচেড়ে দেখে বললেন— ‘এ রকম পুরস্কার পাওয়া এত মূল্যবান বই তুমি বিক্রি করছ কেন? এ বই আমি কিনতে পারব না।’ তার পর কালামের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন— ‘তোমার যখন এতই টাকার দরকার, আমি তোমাকে ষাট টাকা দিচ্ছি। পরে কোনও এক সময় টাকাটা জোগাড় করে আমাকে দিয়ে বইটা ফেরত নিয়ে যেও!’ সেই ব্যক্তিটির মুখ সারা জীবনেও ভুলতে পারেন না— ড. কালাম তাঁর আত্মজীবনীতে এমনটি লিখেছেন।

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *