September 21, 2020

কর্মজীবন

মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ১৯৬০ সালে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংগঠন (ডিআরডিও) এর অ্যারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এস্টাবিলিশমেন্টে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে যোগদান করেন এ পি জে আবদুল কালাম। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি একটি ছোট হোভারক্রাফট এর নকশা তৈরি করে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ড. কালাম ইনকসপার কমিটিতে ড. বিক্রম সারাভাই এর অধীনে কাজ করেছেন। এরপর ১৯৬৯ সালে ইনডিয়ান রিসার্চ অর্গানাইজেশন (আইএসআরও) এ যোগদান করেন। সেখানে তিনি ভারতের কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণকারী যান এসএলভি-৩ এর প্রকল্প পরিচালক ছিলেন, যা ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে ‘রোহিনী’ কৃত্রিম উপগ্রহকে তার কক্ষপথে স্থাপন করে। প্রথম চাকরিতে ড. কালাম মাসে ২৫০ রূপি বেতন পেয়েছিলেন।

ড. কালাম ১৯৬৩-৬৪ সালে নাসার ল্যাংলি রিসার্চ সেন্টার, গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এবং ওয়ালপস ফ্লাইট ফ্যাসিলিটি পরিদর্শন করেন। তিনি ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সালের মাঝে পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (পিএসএভি) এবং এসএলভি-৩ নির্মাণের চেষ্টা করেন। এই কাজে সফলও হয়েছিলেন ড. কালাম।

৪০ বছর ধরে তিনি প্রধানত রক্ষা অনুসন্ধান ও বিকাশ সংগঠন (ডিআরডিও) ও ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় (ইসরো) বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান প্রশাসক হিসেবে কাজ করেছেন। ভারতের অসামরিক মহাকাশ কর্মসূচি ও সামরিক সুসংহত নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে তিনি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ড, বিক্রম সারাভাইয়ের সাথে কাজ করার দুর্লভ অভিজ্ঞতা হয়েছিল ড. কালামের। তরুণ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তার অধীনে থিরুভানানথাপুরাম স্পেস স্টেশনে কম্পেমিট টেকনোলজি, এক্সপ্লেসিভ সিস্টেম এবং রকেট ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেমের ওপর কাজ করেছেন।

ড. সারাভাইয়ের স্বপ্নগুলো বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন যিনি তার নাম সতীশ ধাওয়ান। ১৯৭২ সালে প্রফেসর ধাওয়ান আইএসআরও’র দায়িত্ব নেবার পর তিনি আইএসআরও’কে আরো সমৃদ্ধ করে তোলেন। তার তৈরি পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল ভারতসহ অন্যান্য দেশের বহু স্যাটেলাইটকে বিভিন্ন কক্ষ পথে প্রতিস্থাপন করেছে। এই রকেটটি একই সঙ্গে একাধিক স্যাটেলাইট প্রতিস্থাপনে সক্ষম।

১৯৭২ সালে এসএলভি-৩এর প্রজেক্ট ডিরেক্টর হিসেবে ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট ‘রোহিনী’কে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপনের দায়িত্ব পান ড. কালাম। স্যাটেলাইট ডিজাইন করা, ডেভেলপ করা থেকে শুরু উৎক্ষেপনের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। সে সময় ধাওয়ানের কাছ থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনেক শিক্ষা অর্জন করেন তিনি।

১৯৮২ সালের ৩১ মে ড. কালামের জীবনের আরেকটি স্মরণীয় দিন। প্রফেসর ধাওয়ান আইএসআরও’র একটি কাউন্সিল মিটিং ডাকলেন ভবিষ্যত রকেট উৎক্ষেপন বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। সে মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন পরিচালকবৃন্দ। ড. কালাম লঞ্চ ভেহিকলের ব্যয়ভার ও কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বক্তব্য দিলেন। বক্তব্য শেষ হবার পর ধাওয়ান কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বললেন— ডিআরডিও’র দায়িত্ব পালন করবে ড. কালাম। ধাওয়ানের এই সিদ্ধান্ত ড. কালামের ক্যারিয়ারে ব্যাপক পরিবর্তন আনে এবং এ ক্ষেত্রে তাঁর ব্যাপক অগ্রগতি হতে থাকে।

ডিআরডিও’তে যোগ দিয়ে তিনি ক্ষেপণাস্ত্রের ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু করেন। আইজিএমডিপি (ইন্টিগ্রেডেট গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম)’র কাজ করার সময় তিনি স্থানীয় ডিজাইনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এ ডিজাইনের আওতায় নির্মিত হয় ভূমি থেকে ভূমিতে উৎক্ষেপনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ‘পৃথিবী’। যথার্থ নির্ভুলতা, নিভর্রযোগ্য-পরিচালনা ও নির্ভুলভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের বঙ্কিম পথ অনুসরণের জন্য পৃথিবী’ ভুবন বিখ্যাত মিসাইল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘অগ্নি’তে এসএলভি-৩ এর প্রথম পর্যায়টি জুড়ে দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে ড. কালামের টিমের অনুমোদিত রেক্স (রিএন্ট্রি এক্সপেরিমেন্ট) প্রোগ্রামের ভিত্তিতে ‘অগ্নি’ নির্মিত হয়। ‘পৃথিবী’ ও ‘অগ্নি’ দুটো ক্ষেপণাস্ত্রই ভারতের ডিআরডিও’র প্রথম প্রোডাকশন। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে নির্মিত হয় ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ‘ত্রিশুল’ ও ‘আকাশ’।

তৃতীয় পর্যায়ে তাঁরা বানান ‘নাগ’ মিসাইল, যেটি বিশ্বের সর্বাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞানে ভারত পৃথিবীর যে কোন উন্নত দেশের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা রাখে।

১৯৯৮ সালে পোখরান-২ পরমাণু বোমা পরীক্ষায় তিনি প্রধান সাংগঠনিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন। এটি ছিল ১৯৭৪ সালে স্মাইলিং বুদ্ধ নামে পরিচিত প্রথম পরমাণু বোমা পরীক্ষার পর দ্বিতীয় পরমাণু বোমার পরীক্ষা।

১৯৯৯ সালের শেষ দিকে তিনি ভারত সরকারের ক্যাবিনেট মিনিস্টারের পদমর্যাদার পিন্সিপ্যাল সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজার (পিএসএ) নিযুক্ত হন। তাঁর দলে ছিলেন ড. ওয়াই. এস. রাজন, এবং ড. এম. এস. বিজয়ারাঘবন। আর তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন এইচ. সেরিডন। ওয়াই. এস. রাজন ছিলেন ড. কালামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
একজন বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা ড. কালাম সব রাজনৈতিক দলের সমর্থনে ২০০২ সালে ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত সুনামের সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন।

রাষ্ট্রপতি থেকে অবসর নেওয়ার পর ইনডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (ইন্দোর, মধ্যপ্রদেশ) ইনডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (আহমেদাবাদ), ইনডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (শিলং) এ ভিজিটিং প্রফেসর (বহিরাগত অধ্যাপক) হিসেবে কাজ করেন। ইনডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের (ব্যাঙ্গালোর) অনারারি ফেলো এবং ইনডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (থিরুভানানথাপুরম) চ্যান্সেলর ছিলেন। এছাড়াও আন্না ইউনিভার্সিটিতে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যাপনা করতেন।

কাজপাগল এই মানুষটি দিনে ১৮ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করতেন। কাজকে তিনি প্রচণ্ড রকম ভালোবাসতেন। ড. কালাম তাঁর জীবনীগ্রন্থে লিখেছেন— ‘আমি আমার জীবন শুরু করেছিলাম মইয়ের নিচের প্রথম ধাপ থেকে। আমার প্রথম চাকরি ছিল সিনিয়র সায়েন্টিফিক অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে। ধীরে ধীরে আমি আরো বড় দায়িত্বে নিজেকে নিয়োজিত করি। সবশেষে আমি ভারতের রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করি। নিশ্চিতভাবে গত কয়েক দশকে অনেক কিছু ঘটেছে, সেসব ঘটনা থেকে আমি অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।’

ড. কালাম তাঁর কর্মজীবনে বহুবার প্রতিষ্ঠান বদল করেছেন। তিনি মনে করতেন— কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে নতুন ভানরা সৃষ্টি হয়। আর নতুন ভাবনা অভিনব কাজের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।’
কাজপাগল ড. কালাম তাঁর সারাজীবনে মাত্র দুই দিন ছুটি কাটিয়েছেন, একদিন যখন তাঁর বাবা মারা যান আরেকদিন যখন তাঁর মা মারা যান।

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *