আল মামুন

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

ভারতীয় হিন্দু তীর্থগুলির মধ্যে তামিলনাড়ুর রামেশ্বরাম অন্যতম। দক্ষিণ পূর্ব ভারতের শেষ প্রান্তভূমি পক প্রণালীতে একটি দ্বীপের আকারে গড়ে উঠেছে ছোট এই শহরটি। সীতাদেবির বালুকা দ্বারা নির্মিত মূর্তি ও রামচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ স্থাপিত রয়েছে মন্দিরে। এই রামেশ্বমের এক তামিল মুসলিম পরিবারে ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন আবুল পাকির জয়নুল-আবেদিন আবদুল কালাম। যিনি এ পি জে আবদুল কালাম নামে পরিচিত। আবদুল কালাম যেখানে জন্মেছিলেন তা ছিল উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নির্মিত বংশানুক্রমে বসবাস করে আসা একটি বাড়ি। তাঁর বাবার নাম আবুল ফকির জয়নুল-আবেদিন। বাবার ধন-সম্পত্তি ছিলো না, ছিলো না প্রথাগত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন সহজাত জ্ঞানের অধিকারী আর সত্যিকারের একজন উদারমনস্ক মানুষ। তবে তিনি ছিলেন কঠোর প্রকৃতির মানুষ। তিনি সব ধরণের অপ্রয়োজনীয় আয়েশ আর বিলাসীতা এড়িয়ে চলতেন। তবে খাবারদাবার, জামাকাপড় ওষুধপত্র প্রয়োজনীয় সবকিছুই বাবার কাছ থেকে পেতেন ড. কালাম।

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে ড. কালাম ছিলেন সবার ছোট। সবার বড় বোন, আছিম জোহরা। ভাইয়েরা হলো— মোহাম্মাদ মুথু মীরা, মোস্তফা কামাল এবং কাশেম মোহাম্মাদ।

ড. কালামের বাবা পেশায় ছিলেন মাঝি। তিনি ডিঙি নৌকাও তৈরি করাতেন। এছাড়া স্থানীয় মসজিদের ইমাম ছিলেন। আর মা আশিয়াম্মা ছিলেন গৃহিণী। বাবার অর্থ-সম্পত্তি না থাকলেও তাঁর মায়ের বংশের লোকজন ছিল বেশ মার্যাদা সম্পন্ন। মায়ের পূর্বপুরুষদের একজনকে ব্রিটিশ সরকার ‘বাহাদুর’ উপাধিও দিয়েছিল।

ড. কালামের পরিবার ছিল অত্যান্ত গরিব। তাঁর বাবা ও রামেশ্বরাম ও অধুনা-বিলুপ্ত ধনুষ্কোকাডির মধ্যে হিন্দু তীর্থ যাত্রীদের নৌকায় পারাপার করতেন। পারিবারিক আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় অল্প বয়স থেকেই ড. কালামকে পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য কাজ করতে হয়। তাঁর বড় ভাই পত্রিকা বিলি করতেন। ড. কালামও স্কুলে ক্লাস শেষ করার পর ভাইয়ের সাথে পত্রিকা বিলি করতেন। পত্রিকায় লেখালেখিও করতেন তিনি। আট বছর বয়সেই ড. কালাম প্রথম উপার্জন করেন। সেই সময়ে ‘দিনমনি’ নামে একটি পত্রিকা বিলি করতেন তিনি। সকালে পত্রিকা বিলি করতে বের হওয়ার আগে পত্রিকা পড়ে নিতেন তিনি।

ড. কালামকে ছোটবেলা থেকেই চরম দারিদ্রের মধ্যে বড় হতে হয়েছে। পরিবারের দারিদ্রতা তাঁর পড়ালেখার প্রতি বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর্থিক টানাপড়েনের কারণে স্কুলে পড়ার দিনগুলোতে ব্যয় সঙ্কুলান করতে নিরামিষভোজী হতে হয় তাঁকে। কোনো রকম ভাবে দুবেলা খেয়েও তাঁকে দিন পার করতে হয়েছে।

ড. কালাম তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন— ‘আমি তখন আট বছর বয়সের ছিলাম। তবে তখনই পরিবারের জন্য উপার্জন করবো বলে ভেবেছিলাম।’

ড. কালাম রান্নাঘরের মেঝেতে বসেই খেতেন। তাঁর মা সামনে আগে একটি কলাপাতা বিছিয়ে দিতেন। তারপর তাতে ভাত, সুগন্ধী তরকারি, ঘরে তৈরি আচার আর নারিকলের চাটনি পরিবেশন করতেন।

সব ভাই-বোনোর মধ্যে ছোট হওয়াতে ড. কালাম আদরযত্ন একটু বেশিই পেতেন। তাঁর বাবা-মা ছিলেন সুদর্শন। তাঁর অন্য সব ভাই বোনও দেখতে অনেকটা বাবা-মার মত হয়েছিল। কিন্তু তিনি সবার থেকে কালো এবং বেটে ছিলেন। খেয়ে না-খেয়ে বেড়ে ওঠা তামিলনাড়ুর সেই এলোমেলো চুলের কালো মানুষটি একদিন ভারতের কালোমানিকে পরিণত হয়েছিলেন।

চলবে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *