আল মামুন

মানবাধিকার লড়াইয়ের জন্য শান্তিতে নোবেল বিজয়ী রাজনীতিক গাইছেন গণহত্যার সাফাই!

মানবাধিকার লড়াইয়ের জন্য শান্তিতে নোবেল বিজয়ী রাজনীতিক গাইছেন গণহত্যার সাফাই!

আল মামুন
২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় উগ্র বৌদ্ধরা। গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা- এমন কোনো অপরাধ নেই, যা সেখানে ঘটায়নি তারা। রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো অগ্নিকুণ্ডে রূপ নেয়। সন্তান, স্বামীর সামনে ধর্ষণ করা হয় নারীদের।

এমন ভয়াবহতায় জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। এভাবে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু নৃশংসতার অভিযোগ যেমন সেনাবাহিনী প্রত্যাখ্যান করেছে, তেমনি যাকে মানবতার প্রতীক, গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো সেই অং সান সু চি পর্যন্ত এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় বাংলাদেশ যে মহানুভবতার পরিয়চয় দিয়েছে তা বিশ্ববাসী দেখেছে। তবে বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা সংকটের চরম ভুক্তভোগী। এ সংকট দেশের নিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। মানবিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এ অবস্থা আর দীর্ঘস্থায়ী হওয়া উচিত নয়। এ অবস্থায় মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে গাম্বিয়ার সঙ্গে থাকতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশ মামলার শুনানিতে গাম্বিয়াকে নেপথ্যে থেকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, একই অঙ্গীকার করেছে কানাডা ও নেদারল্যান্ডস।
আইসিজে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এ বিচার আদালতের রেজিস্ট্রারের বরাতে প্রকাশ, আইসিজের যে কোনো রায়ই চূড়ান্ত ও অবশ্যপালনীয়। এরই মধ্যে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণে মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ন্যায়বিচার পাবে- এটাই প্রত্যাশা। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী মর্যাদার সঙ্গে স্বদেশে ফিরতে পারলে মানবতারই জয় হবে।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু হয়েছে মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর)। ৫৭টি মুসলিম দেশের সংগঠন ওআইসির পক্ষে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এ মামলা করেছে আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশ গাম্বিয়া।
মানবতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় গাম্বিয়া এবং ওআইসির প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা।
বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, তিন দিনব্যাপী এ শুনানির প্রথম দিন গাম্বিয়া তার বক্তব্য উপস্থাপন করবে, বুধবার (১১ বুধবার) মিয়ানমার তার অবস্থান তুলে ধরবে। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে গাম্বিয়া এবং বিকালে মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন ও চূড়ান্ত বক্তব্য পেশ করবে।
রোহিঙ্গাদের শান্তির সন্ধানে এটি একটি যুগান্তকারী মামলা হিসেবে এরই মধ্যে দুনিয়ার দৃষ্টি কেড়েছে এবং বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ মিয়ানমারের বর্বর হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংসতার সমুচিত বিচারের প্রত্যাশায় তাদের অভিমত প্রকাশ করেছে।
এদিকে শুনানির আগ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর হলো, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ চালানো অপরাধ প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিতে অং সান সু চির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সাতজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। অন্যদিকে রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বৈশ্বিকভাবে মিয়ানমারকে বয়কটের ডাক দিয়ে এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিশ্বের ১০ দেশের ৩০টি মানবাধিকার, শিক্ষাবিদ এবং পেশাদারদের সংগঠন।
আইসিজে গাম্বিয়ার মামলাটি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। মামলাটি মিয়ানমারকে অস্বস্তি ও চাপে ফেলেছে, এর একটি বড় প্রমাণ এ মামলায় লড়তে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি নেদারল্যান্ডস গিয়েছেন। যেখানে এ কাজের জন্য দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলই ছিলেন যথেষ্ট।
এটা দুঃখজনক যে, এই প্রথম মানবাধিকার লড়াইয়ের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একজন রাজনীতিক গণহত্যার সাফাই দিতে হাজির হচ্ছেন হেগে। এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে বিশ্ববাসীর জন্য!
১১ ডিসেম্বর ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *