আল মামুন

বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত রাজধানীবাসী, মুক্তি মিলবে কি?

বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত রাজধানীবাসী, মুক্তি মিলবে কি?

আল মামুন
 
বায়ুদূষণে বিরক্ত, বিপর্যস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের বাসিন্দা। বিশেষ করে শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের কাছে শহরের জীবন হয়ে পড়েছে চরম কষ্টদায়ক।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিবেচনায় ঢাকা বিশ্বের সর্বোচ্চ বায়ুদূষণ ও বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। জনদুর্ভোগের বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগগুলো যদি সুপরিকল্পিত, সুসমন্বিতভাবে কাজ করে তাহলে এ থেকে মানুষের মুক্তি  মিলতে পারে।
বায়ুদূষণের প্রভাবে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। এর জন্য দায়ী অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা। যারা বায়ুদূষণের জন্য দায়ী তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত।
ব্যক্তিগত দুই দশকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে ফুসফুস তথা শ্বাসনালির অসুস্থতার কারণে। এর জন্য দায়ী অন্যতম প্রধান উপাদান হচ্ছে ধোঁয়া, ধুলাবালু ও অজস্র রাসায়নিক পদার্থ। এসবের প্রধান উৎস হচ্ছে মোটরযান, কলকারখানা ও ইটভাটা।
গত বছর ১৯৭ দিন ঢাকাবাসী দূষিত বাতাসে ডুবেছিল। আগের বছরগুলোতে রাজধানীর বাতাস বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১২০ থেকে ১৬০ দিন দূষিত থাকত। অর্থাৎ ঢাকার বায়ুদূষণ সময়ের বিবেচনায়ও বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এতথ্য পাওয়া গেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, রাজধানীর বাতাসে দ্রুত দূষণকারী পদার্থ ছড়িয়ে পড়ছে মূলত অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজের কারণে। আর দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই সরকারি। পরিবেশ অধিদপ্তর এদের কয়েকবার চিঠি দিয়ে দায় সেরেছে। কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বায়ুদূষণ কমাতে একটি নীতিমালা প্রণয়নের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, পরিবেশ সচিবের নেতৃত্বে কমিটিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রতিনিধি, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) প্রতিনিধি ও প্রয়োজন হলে একজন বিশেষজ্ঞকে রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ এলাকায় অবৈধ (পরিবেশ ছাড়পত্রবিহীন) ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে রাস্তা ও ফুটপাতে ধুলাবালি, ময়লা ও বর্জ্য থাকলে এগুলো অপসারণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, পৃথিবীর যেসব শহর বায়ুদূষণে ধুঁকছে, সেগুলোর তালিকার একদম শীর্ষের কাছাকাছি রয়েছে ঢাকা। ভারতের দিল্লি সবার ওপরে, ঢাকা ঠিক তার পরেই। কখনও কখনও ঢাকা দিল্লিকেও ছাড়িয়ে যায়।
‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের যে পাঁচ দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, বাংলাদেশ সেগুলোর অন্যতম। আর বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মারা গেছে।
উল্লেখ্য, বায়ুদূষণের প্রধান দুটি কারণ হলো শিল্পকারখানার বর্জ্য ও যানবাহনের ধোঁয়া। নন-কমপ্লায়েন্স শিল্প ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বিশেষত শহরের বাতাস দূষিত হচ্ছে অধিক হারে। রাস্তাঘাট ও নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনার ধূলিকণা, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, কার্বন মনোঅক্সাইড, সিসা ও অ্যামোনিয়া বাতাস দূষণের জন্য অনেকাংশে দায়ী। ইটভাটার ধোঁয়া এ ধরনের দূষণের আরেকটি বড় কারণ।
বায়ুদূষণ শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশ ও স্নায়ুর মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত ও মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। এর কারণে বিভিন্ন রোগ যেমন- হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্যান্সার বাড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এরূপ দূষণের সঙ্গে দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য সংকট ও সামাজিক অবিচারের বিষয়গুলোও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ঢাকার হাসপাতালগুলোতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দিন দিন নগরবাসীর স্বাস্থ্য বিপর্যয় বেড়ে চলেছে। এছাড়া দূষিত বায়ু মানুষের দীর্ঘজীবন লাভে প্রতিবন্ধক।
বেঁচে থাকার জন্য বায়ু অত্যাবশ্যক। সে বায়ু যদি বিশুদ্ধ না হয় তাহলে বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দেবে এটাই স্বাভাবিক। সংগত কারণেই ধুলাদূষণ কমানোর জন্য প্রতিদিন বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীর রাস্তায় পানি ছিটানো প্রয়োজন। অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। সড়ক ও ভবন নির্মাণের সময় নির্মাতা ও ঠিকাদারদের ওপর কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা উচিত- যাতে তারা আইনকানুন মেনে চলেন এবং নির্মাণ স্থানগুলোর ওপর আচ্ছাদন (কভার) দিয়ে রাখে এবং ধুলা নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি ছিটায়। এজন্য প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ ও যথাযথ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বায়ুদূষণ কমাতে অচিরেই হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়ন হবে- এমনটাই প্রত্যাশা জনসাধারণের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *