আল মামুন

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী মাইলফলক হয়ে থাকবে সাত জঙ্গির ফাঁসির রায়

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী মাইলফলক হয়ে থাকবে সাত জঙ্গির ফাঁসির রায়

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকা বলে পরিচিত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করেছিল জঙ্গিরা। তাদের গুলিতে পুলিশের দুই কর্মকর্তাও নিহত হন।
পরে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দলের কমাণ্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। ওই ঘটনার পর গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করে পুলিশ। ওই বছরের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। আর এর মধ্য দিয়েই হলি আর্টিজান হামলা মামলার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তিন বছর ধরে মামলার প্রক্রিয়া চলার পর অবশেষে রায় প্রকাশিত হয়েছে।
বহুল আলোচিত হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা মামলায় সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। ২৭ নভেম্বর, বুধবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ঘোষিত এ রায় প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। পবিত্র রমজান মাসেও তারা এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে কোনো দ্বিধাবোধ করেনি। উপরন্তু তারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র হরণের চেষ্টা করেছে। যথার্থ কারণেই এ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আসামিরা কোনো ধরনের অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারে না। বাস্তবেও এরা সমাজের কোনো পক্ষেরই সহানুভূতি পায়নি, বরং সবাই এই ঘৃণ্য ঘটনায় স্তম্ভিত ও বিমূঢ় হয়েছে।
প্রকাশ যে, এ হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’র নামে দায় স্বীকার করা হলেও পুলিশ বলছে, এ হামলায় জড়িতরা জঙ্গিগোষ্ঠী নব্য জেএমবির সদস্য। হামলার পর দেশব্যাপী তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়। তবে আশার কথা হলো, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের জিরো টলারেন্স অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের পর সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে অনেকাংশে রুখে দেওয়া সম্ভব হয়।
মামলার রায়ে সাধারণ মানুষ নিঃসন্দেহে স্বস্তিবোধ করছে, একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবার কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পেয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, জঙ্গিদের দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জোরালো বার্তা প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। এ মাইলফলক রায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
আবহমান বাংলা শান্তি ও সহনশীলতার যে পরম্পরা বহন করে চলেছে, হলি আর্টিজান হামলা ছিল তার ওপর বড় ধরনের একটি আঘাত। এক কথায় বলা যায়, হলি আর্টিজানের নির্মমতা ছিল বাংলাদেশের মৌল ভিত্তি নড়বড়ে করে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা। এরই মধ্যে জঙ্গিবাদকে অনেকটাই দমানো সম্ভব হয়েছে, তবে একেবারে নির্মূল করা যায়নি বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
অন্যদিকে জঙ্গিবাদ এখন আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে, তাই একে নির্মূল করা অত্যন্ত জটিল। তাই সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াই সর্বদা চলমান রাখতে হবে। অন্যদিকে রায় বাস্তবায়ন এখন একটি চ্যালেঞ্জ। সবার প্রত্যাশা, রায়ের চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিতে সময়ক্ষেপণ হবে না। এ রায় আবারও প্রমাণ করেছে বাংলাদেশে ঘাতকদের ঠাঁই নেই। এ ধারা অব্যাহত রাখতে অবশ্যই সব ধরনের উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *