আল মামুন

ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে সিরাজের মতো এমন ‘আলেম’রাই, নাস্তিকরা নয়

ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে সিরাজের মতো এমন ‘আলেম’রাই, নাস্তিকরা নয়

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে গত ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। এর কারণ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনা শ্লীলতাহানির অভিযোগ প্রত্যাহার করতে রাজি না হয়নি নুসরাত। আগুনে নুসরাতের শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতলের বার্ন ইউনিটে মারা যান।
এর আগে ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ নুসরাতকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ফেনীর ওই মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ ও রাফি হত্যা মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদ দৌলা একজন ভয়ঙ্কর অপরাধী। তিনি বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি করে গেলেও থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সিরাজ জামায়াত ইসলামীর নেতা হলেও নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতে ২০০১ সাল থেকেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুসম্পর্ক। আর কৌশল হিসেবে ওইসব নেতাকে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতেন তিনি। যারা অপরাধী তারা যে দলেরই হোক না কেনো নিজেকে রক্ষা করার জন্য অন্য সব দলের শীর্ষ নেতাকর্মী, প্রশাসন বা ক্ষমতাকে নিজের আয়ত্বে নিয়ে রাখেন। নিজেকে সেভ রাখার জন্য সব রকমের কৌশলের আশ্রয় নেন তারা। সিরাজও তেমনটি নিয়েছিলেন।
যুগান্তর পত্রিকার এক খবর থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর মাদ্রাসার তহবিল থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সিরাজের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকে এনামুল করিম। অথচ পরে এ নিয়ে আর কিছুই হয়নি।
এমনকি সোনাগাজী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ফেনীর মহীপালে ২০১৩ সালে উম্মল ক্বুরা নামে একটি মাদ্রাসা এবং ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। ওই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান তিনি। সেখানেও বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আবদুল কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে এক কোটি ৩৯ লাখ টাকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২০১৫ সালে ফেনীর আদালতে মামলা দায়ের করেন। এই মামলা এখনও বিচারাধীন। এই মামলায় একাধিকবার তিনি কারাগারেও ছিলেন।
এদিকে ১৯৯৬ সালে ফেনী সদরের দৌলতপুর সালামতিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে অনিয়ম এবং ছাত্র বলাৎকারের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
ফেনী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন যুগান্তরকে জানিয়েছেন, তিনটি নাশকতার মামলা আছে সিরাজের বিরুদ্ধে। এছাড়া ২০১৫ সালের পর থেকে কলেজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। অধ্যক্ষ নিয়ন্ত্রিত গ্রুপটির নেতৃত্ব দেয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন। মাদ্রাসার নিজস্ব তহবিল থেকে সাততলা ভবন তৈরির অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে এই গ্রুপটি তৎপর হয়ে ওঠে।
সূত্র জানায়, গত বছর পুরনো ভবন ভাঙার কাজের ঠিকাদারি পান রুহুল আমিনের সহযোগী মাকসুদ আলম। পরে বিক্ষুব্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে পৌরসভায় অভিযোগ দেন শেখ আবদুল হালিম মামুন। পরে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এনিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। মাদ্রাসা মার্কেট থেকে প্রতি বছর মার্কেটে আয় হতো এক লাখ টাকা। এই টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়েও দুই গ্রুপের দ্বন্দ্ব ছিল।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, আমি কাউকে শেল্টার দেইনি। আমি কোনো ভাগবাটোয়ারাতেও নেই। ছয় মাস আগে কেন আমাকে কমিটিতে ঢোকানো হল এটাও রহস্যজনক।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি অধ্যক্ষের অপকর্মের বিরোধিতা করেন। তিনি কাউকে কখনই শেল্টার দেননি বলেও দাবি করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত অক্টোবরে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা আরও এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেছিলেন। ওই ছাত্রী স্থানীয় অন্য একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষের মেয়ে। ওই ছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করেছিলেন তিন শিক্ষক। পরে অধ্যক্ষ তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।
পরে বিষয়টি ম্যানেজিং কমিটির মিটিংয়ে ওঠে। সেখানে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পদাধিকারবলে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আক্তারুন্নেছা শিউলি ওই মিটিংয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে আলটিমেটাম দেন। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।
এ বিষয়ে ওই ছাত্রীর বাবা শুক্রবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, ওই সময় আমি অধ্যক্ষ সিরাজকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলে তিনি অস্বীকার করেছেন। তখন তিনজন শিক্ষক এর প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে তাদের নাজেহাল করতে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। পরে আমরা আর এ নিয়ে লিখিত অভিযোগ দিইনি।
তবে জেলা প্রশাসন বরাবর এ নিয়ে একটি অভিযোগ দিয়েছিল। সেটার তদন্ত হওয়ার কথা শুনেছিলাম। পরে আর অগ্রগতি হয়নি।
প্রতিবাদকারী গণিত বিভাগের শিক্ষক বেলায়েত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমরা যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করে তিনজন কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছিলাম। আমরা চাই কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির শিকার না হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার নুরুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি করার দাবি তিনি তুলেছিলেন। পরে আর এ নিয়ে তদন্ত হয়নি।
সিরাজ একজন অপরাধী এটা এখন সর্বজন স্বীকৃত। ধরা পড়লেই ‘অপরাধী’, ধরা না পড়ার আগে সবাই সাধু। সিরাজ একজন আলেম মানুষ। আমলের মাধ্যমে বা কাজেকর্মে আলেম না হলেও অ্যাকাডেমিকভাবে সে একজন স্বীকৃত আলেম। ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিশ্চয়ই সর্বোচ্চ ডিগ্রি তার নেয়া আছে। জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তিনি হয়েছেনও একটা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, অধ্যক্ষ। তিনি সমাজের সর্বজন একজন শীর্ষস্থানীয় একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব- এটাই হলো মূল কথা।
আমার-আপনার মত একজন সাধারণ মানুষ ‘সব কিছু’ করতে পারি, করে বলতে পারি-ভাই এটা আমার জানা ছিলো না। কিন্তু আল্লাহ-রাসুল-ইসলাম-জান্নাত-জাহান্নাম-কোরআন-হাদিস বিষয়ে সর্বোচ্চ শিক্ষা নিয়ে তিনি কেনো এতো অপকর্ম করে বেড়াবেন? এই প্রশ্ন আমার গোটা আলেম সমাজের কাছেই।
ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে দেখা গিয়েছে যে তথাকথিত ‘নাস্তিকরা’ বা ‘অবিশ্বাসীরা’ বা ‘মুক্তমত’ প্রকাশকারীরা আলেম সমাজের ক্ষোভের শিকার হয়েছেন। তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় ঝাপিয়ে পড়েছেন, আন্দোলনে মাঠ গরম করে ফেলেছেন। অথচ সিরাজের মত আলেম নামের একটা জানোয়ারের বিরুদ্ধে সেরকম আন্দোলন-সংগ্রাম তাদের করতে দেখা গেলো না। করলেও ঘটনার অনেক পরে একটু ‘হালকা’ আওয়াজ তুলেছেন দায়সারা ভাবে।
আমি মুহাম্মদ (স.) কে দেখিনি, শুধু কোরআন হাদিস পড়ে জেনেছি, তিনি নবী ছিলেন। কিন্তু তার আদর্শিক মানুষ যারা আছেন আমাদের চার পাশে, বড় বড় আলেম, অতি ধার্মিক, অতি পরহেজগার, আমলদার, পীর সাহেব, সুবক্তা-ওয়ায়েজিন, ইমাম সাহেব কিংবা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান তাদের দেখেই তো আমি বা আমরা আল্লাহর পথে যাওয়া শিখবো, ইসলামকে জানবো, নবী মুহাম্মদের (স.) দেখানো পথে যাবো।
কিন্তু তারাই যদি এমন সব গুরুতর অপরাধ-অপকর্ম করেন, মিথ্যা বলেন, মুনাফকি করেন, ওয়াদা ভঙ্গ করেন, মানুষ ঠকান, কথায় কথায় মিথ্যা বলেন, সবচেয়ে বড় কষ্টের কথা তারা নিজেদের মেয়েদের বয়সী মেয়েদের ধর্ষণ করেন, যৌন হয়রানি করেন, শ্লীলতাহানী করেন, তাহলে আমি বা আমরা যারা ধর্মকর্ম বুঝিনা, কিন্তু বুঝতে চাই, ধর্মকর্ম করতে চাই, নামাজ-রোজা শিখে আমল করতে চাই তারা কার কাছে যাবো? আমরা সমাজের কাকে বিশ্বাস করবো? কার প্রতি আমরা আস্থা রাখবো?
আমার কথা হচ্ছে যারা আলেম তারা কেনো পাপ করবেন, তারা কেনো সমাজের সবচেয়ে ঘৃণিত কাজগুলো করবেন? আমার কথা হচ্ছে তারা এসব করতে পারবেন না, পারবেন না, পারবেন না তো পারবেন ন। তারা হতে হবে ফেরেশতার মত। যেনো সাধারণ মানুষ-বিধর্মীরা তাদের দেখেই ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে। সব কাজকাম ফেলে রেখে মসজিদে ছুটে যায়। কিন্তু এখনকার অধিকাংশ আলেমদের দেখে মনে হয় মসজিদে না আমার পতিতালয়ে যাওয়াই শ্রেয়!
এসব ভন্ড আলেমদের যদি এতোই খায়েশ থাকে তাহলে তো তারা পতিতালয়েই যেতে পারে? তাদের নিষেধ করেছে কে? তারা যদি মাগিবাজিই করতে চায়, তাহলে তারা ধর্মের লেবাস খুলে রেখে তা করুক, কেউ নিষেধ করবে না। তারা কেনো ধর্মীয় লেবাস নিয়ে অপকর্ম করে ইসলামের সর্বনাশ করছেন? কে দিয়েছে তাদের এই অধিকার? সিরাজ ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু, সে আলেম নামের ভন্ড।
আমি নিজেও নামাজ পড়ি পাঁচ ওয়াক্ত, রোজা রাখি। ধর্মীয় অন্য সব আমল করার চেষ্টা করি। কিন্তু যখন দেখি যে মসজিদের ইমামের দ্বারা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, মাদরাসার শিক্ষক শিশুদের বলাৎকার করে, ধর্ষণ করে, যৌন হয়রানি করে তখন নিজেকে মুসলমান পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে, সত্যি অনেক দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলছি, আমার খুব লজ্জা লাগে। একজন আলেম এসব করে কীভাবে! আমার মাথায় ঢোকে না।
আমি আলেমদের উদ্দেশে বলছি, ভাই শোনেন, নাস্তিক-মুরতাদরা যত না ইসলামের ক্ষতি করছে, তার চেয়ে বেশি ইসলামের ক্ষতি করছে সিরাজ উদ দৌলার মত এমন আলেমরাই। এমন আলেম সমাজে আরও আরও আছে। আপনারা এদের খুঁজে বের করুন, আইনের হাতে ধরিয়ে দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *