আল মামুন

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানই যদি শ্লীলতাহানী করেন…

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানই যদি শ্লীলতাহানী করেন…

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল আলিম পরীক্ষার্থী ছিল নুসরাত জাহান রাফি। গত ২৭ মার্চ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তার পিয়ন নুরুল আমিনকে দিয়ে নুসরাতকে নিজ কক্ষে ডেকে নেন অধ্যক্ষ সিরাজ। নুসরাত তখন আরও তিন-চারজন বান্ধবীকে নিয়ে অধ্যক্ষের রুমে ঢুকতে চাইলে শুধু তাকে ঢুকতে দেন পিয়ন। এরপর দরজা আটকে অধ্যক্ষ বিভিন্ন প্রলোভন দেখান।
১ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার আধা ঘণ্টা আগে তাকে প্রশ্ন দেওয়া হবে, যদি তিনি অধ্যক্ষের ‘কুপ্রস্তাবে’ রাজি হন। এরপর অধ্যক্ষ নুসরাতের শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর নুসরাত দৌড়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে বাইরে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে যান। এরপর মাদ্রাসায় থাকা ছোট ভাই রায়হানকে খবর দেওয়া হলে সে বোনের কাছে যায়।
এরপর অধ্যক্ষ তাকে জানান, তার বোন অসুস্থ। অসুস্থ থাকার কারণে অধ্যক্ষের কাছে এসেছিল ছুটির আবেদন করতে। এখানে এসে আবার সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেখান থেকে নুসরাতকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হলে স্বজনদের জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ তাঁর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছিলেন। এরপরে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বজনরা মাদ্রাসায় গিয়ে অধ্যক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তবে তিনি ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এরপর মাদ্রাসা অধ্যক্ষ উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতাকে ফোন দেন।
আওয়ামী লীগের নেতা পুলিশসহ মাদ্রাসায় যান। তবে মাদ্রাসায় গিয়ে সব ছাত্রছাত্রীর মাধ্যমে সত্য ঘটনা জানতে পেরে পুলিশ উল্টো অধ্যক্ষকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এরপর নুসরাতের মা বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় পরের দিন তাঁকে আদালত পাঠানো হয়। আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান।
মাদ্রাসায় দশম শ্রেণিতে পড়ে তার ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। দগ্ধ বোনের বরাত দিয়ে সে সংবাদমাধ্যমকে এসব কথা জানান। তিনি জানান, শনিবার সকালে মাদ্রাসায় গেলে এক ছাত্রী তার বোন নুসরাতকে বলে যে তার বান্ধবী নিশাতকে কারা যেন ছাদে মারধর করছে। পরে নুসরাত মাদ্রাসার তৃতীয় তলার ছাদে গেলে সেখানে বোরকা পরা ও হাতে মোজা লাগানো চার ছাত্রী তাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয়। বলে যে, মামলা তুলে না নিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। এরপর নুসরাত মামলা তুলে নেওয়ার কথা প্রত্যাখ্যান করে তার শ্লীলতাহানির চেষ্টার বিচার দাবি করেন। পরে ওই চারজন তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তারা পালিয়ে যায়।
এ খবর ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে দেশের সব সংবাদমাধ্যমে। দগ্ধ নুসরাতের ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। ছবির দিকে তাকানো যায় না। তার পুরো শরীরেই ব্যান্ডেজ, সাদা কাপড়ে মোড়ানো, শুধু মুখটুকু ছাড়া। দগ্ধ নুসরাত বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মারা যায় সে।
নুসরাত মাদ্রাসায় পড়তো। নিশ্চয়ই বাবা-মা চেয়েছিল তার মেয়েকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। চাইতেই পারেন, এটা তো তাদের অপরাধ না। কিন্তু কথা হচ্ছে, যিনি ধর্মীয় শিক্ষা দিবেন, তিনি অন্য সবার মত একজন সাধারণ মানুষ নন, সাধারণ শিক্ষক নন, তিনি পুরো
একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ধর্মীয় শিক্ষক, প্রিন্সিপ্যাল, অধ্যক্ষ। তিনি সমাজের নের্তৃস্থানীয় ব্যক্তি। অনেক বড় আলেম। হয়তো বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ-মাহফিলও করে বেড়ান। তার ‌‌‘ইমান-আকীদা’ তো অন্য সবার থেকে একটু বেশিই ‘মজবুত’ থাকার কথা। তিনি কেনো তার নিজের মেয়ের বয়সী একটা শিক্ষার্থীর দিকে লালসার দৃষ্টিতে তাকাবেন? কেনো কামুক দৃষ্টিতে তাকাবেন? কেনো শ্লীলতাহানি করবেন?
একজন ধর্মীয় শিক্ষক, একজন ইমাম— সমাজের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য এবং অনুকরণীয় ব্যক্তি। সমাজের সবাই এদের পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখেন, সম্মান করেন। সাধারণ মানুষ তাদের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষা নেন, নীতি-নৈতিকতা শেখেন। ইহকাল-পরকাল সম্পর্কে জানেন। জান্নাত-জাহান্নামের পার্থক্য বুঝতে শেখেন। এখন তারা যদি এমন অপকর্ম করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটা আর থাকলো কই?
সমাজের সবচেয়ে ‘পবিত্র’ মানুষ যদি এমন গুরুতর ‘অপবিত্র’ কাজ করে বসে, তাও বুঝে-শুনে, সজ্ঞানে, তাহলে বুঝে নিতে এই গ্রহে যা-ই থাকুক মানুষ মূলত আর অবশিষ্ঠ নেই, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। শুধু শুধু নীতিবাক্য শুনিয়ে, ওয়াজ-নসিহত করে, কোরআন-হাদিসের বাণী শুনিয়ে বেহেশতো পাওয়া যায় না, বেহেশতো এতো সহজ জায়গা নয়। আগে নিজেকে তো ধর্ম মানতে হবে? ধর্ম মানে ক’জন? অধিকাংশই তো ধর্মের লেবাস পরে নিজের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *