আল মামুন

চার দেয়ালে বন্দি জীবন

চার দেয়ালে বন্দি জীবন

১৯৩৮ সালে বয়স যখন ১৮, তখন একবার কারাগারে যেতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তবে সেটা ছিল একান্তই অরাজনৈতিক। রাজনৈতিক কারণে তাঁর প্রথম কারাবরণ হয় পাকিস্তান সৃষ্টির ছয় মাসের মাথায়, ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। মাত্র পাঁচ দিনের সেই কারাবাসকালে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা পরিস্থিতির ওপর শেখ মুজিবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, দৃঢ়চিত্ততা, নেতৃত্ব গ্রহণের গুণ চিনিয়ে দেয় ভবিষ্যতের এক নেতাকেই।

বঙ্গবন্ধুকে প্রধান প্রতিপক্ষ এবং শত্রু বিবেচনা করতো পাকিস্তানিরা। অধিকার আদায় করতে গিয়ে তাঁকে ৫৪ বছরের জীবনেচার হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করতে হয়েছে, যা তাঁর মোট জীবনের এক চতুর্থাংশ। কিন্তু কখনোই তিনি মুক্তির প্রশ্নে আপোসে যাননি। তাঁর আত্মসম্মানবোধ তাঁর আত্মবিশ্বাসের মতোই ছিল দৃঢ়। তাঁর মতো অকুতোভয় ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে বিরল।

১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি গোপালগঞ্জের মিশন স্কুল পরিদর্শনে আসেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং বাণিজ্য ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাদের আগমন উপলক্ষে সংবর্ধনার আযোজন করে স্থানীয় কৃষক-প্রজাপার্টি এবং মুসলিম লীগ। কিন্তু এর বিরোধীতা করে স্থানীয় কংগ্রেস দলের সমর্থকরা। তারা চায় না যে মন্ত্রী গোপালগঞ্জে আসুক এবং এখানে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হোক। স্কুলছাত্র শেখ মুজিব ছাত্রদের নিয়ে সংবর্ধনার পক্ষে কাজ করেন। তাঁর উদ্যম, উদ্যোগ আর সাহসিকতা দেখে কংগ্রেসিরা পিছিয়ে যায়। মন্ত্রীদ্বয় গোপালগঞ্জে পরিদর্শন করে ফিরে যান। এরপর কংগ্রেসিদের অভিযোগের ভিত্তিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। হাজতে কাটাতে হয় সাত দিন। তখন তাঁর বয়স আঠারো বছর।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম রাজনৈতিক কারবাস ছিল ১৯৪৮ সালে। এ বছর ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন তিনি। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর কারাগারে গিয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন।

১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে আট দিন পর মুক্তি পান ওই বছরের ২৮ জুন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আবারও ২৭ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৮৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়। সে সময়ে ২০৬ দিন কারাভোগ করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হয়ে তাঁকে এক হাজার ১৫৩ দিন কারাভোগ করতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেফতার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় ১৫৮ দিন কারাভোগ করেন।

এরপর ১৯৬৪-৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই গ্রেফতার হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন।

১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ গ্রেফতার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি এক হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। সর্বশেষ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চেও প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ২৮৮ দিন বন্দি থাকেন পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ানপুরের মিয়ানওয়ালী কারাগারে। সেখান থেকে মুক্তি পান ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি।

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনে বারবার জেল, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে আলোয় উদ্ভাসিত করে গেছেন একটি জাতিসত্তাকে, একটি স্বাধীন ভ‚খন্ডকে। বঙ্গবন্ধু তাঁর জেল জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, ‘জেলে যারা যায় নাই, জেল যারা খাটে নাই—তারা জানে না জেল কি জিনিস। বাইরে থেকে মানুষের যে ধারণা জেল সম্বন্ধে ভিতরে তার একদম উল্টা। জনসাধারণ মনে করে চারদিকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, ভিতরে সমস্ত কয়েদি একসাথে থাকে, তাহা নয়। জেলের ভিতর অনেক ছোট জেল আছে।’

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *