আল মামুন

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি

বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে আজ একটি স্বাধীন দেশের নাম। আমরা পরাধীনতার শৃৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসা মুক্ত জাতি। আমাদের এই স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তিনি। এরপর দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বহুল আকাঙ্খিত স্বাধীনতা অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। আমরা পেয়ে যাই একটি স্বাধীন ভূখন্ড। যেটি আমাদের আত্মপরিচয় বহন করে। আর এ জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিতে হয়েছে ৩০ লক্ষ বাঙালির জীবন।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি চেতনার নাম। তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন স্বাধীনতার রক্ষার আন্দোলনে। মাটি ও মানুষের ভালোবাসাকে স্থান দিয়েছেন সবকিছুর উর্ধে। বাঙালির মর্মে গাঁথা এক অধ্যায়— বঙ্গবন্ধু। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ছিল তাঁর। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে এবং স্বাধীন সার্বভেমৈ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অসমান্য অবদান রেখে গেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির হৃদয়ে এই ত্যাগী রাজনীতিবিদ ও মানবহিতৈষীর স্থান অমলিন। ইতিহাসেও তিনি হয়ে আছেন চিরভাস্বর।

বঙ্গবন্ধুর কথা বলার ধরণ ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রবলতা আর গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর যে কোনো মানুষকেই সহজেই আকৃষ্ট ও মোহাবিষ্ট করে ফেলতে পারতো। বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় থাকতো বিস্ময়কর মাদকতায় ভরা বিস্ফোরক শব্দাবলির নিপুণ বিন্যাস। তিনি কোনো রকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে প্রতিপক্ষের হাড়কাঁপানো জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে পারতেন। তাঁর কথা বলার ধরণের সরসতায় বক্তৃতা হয়ে উঠতো জনচিত্তহারী এক নিপুণ শিল্প। তাঁর বক্তৃতার সৌন্দর্যভরা ও আকর্ষণীয় শিল্পগুণের জন্যই।

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত সাপ্তাহিক সাময়িকী নিউজইউক ‘রাজনীতির কবি’ (পোয়েট অব পলিটিক্স) আখ্যায়িত করেছিল।

বঙ্গবন্ধুকে বলা হতো ‘ক্যারিশমাটিক লিডার’। অর্থাৎ তাঁর ছিল সম্মোহনী শক্তি। তাঁর যাবতীয় গুণাবলী অন্যকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতো। রাজনৈতিক জীবনে অন্যকে মোহাবিষ্ট করার গুণাবলী অর্জন করেই বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন দুঃখ-দৈন্যপীড়িত, দুর্দশাগ্রস্ত ও উপেক্ষিত-বঞ্চিত বাঙলির মহান জাতীয়তাবাদী নেতা; বাঙালির শতসহস্র বছরের স্বাধীন রাষ্ট্রকামনা বাস্তবায়নের মহান রূপকার।

২০০৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ মার্চ ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ শিরোনামে একটি জরিপ পরিচলানা করে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি বাংলা। জরিপে বাংলাদেশ ভারতসহ বিশ্বব্যাপী অবস্থানরত বাঙালিরা অংশ নেয়। বাঙালিদের ভোটদানের ভিত্তিতে ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে ঘোষণা করে বিবিসি।

কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষ শতসহস্র বছরের নানা উপাদান, নানা ক্ষেত্রে প্রতিভাবানের তাৎপর্যপূর্ণ অবদানে ধীরে ধীরে একটি জাতি হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠে; এবং কোনো একটা যুগে সেই জাতি তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্বিক ও রাষ্ট্রসত্তাগত চেতনায় সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে। দেশের সর্বস্তরের ব্যাপক বিপুল মানুষের মনে এই সর্বোচ্চ চেতনার স্তর সৃষ্টিতে যে নেতার প্রধান ভ‚মিকা থাকে এবং সে ভ‚মিকা সর্বজনস্বীকৃত হয়ে যখন তা একটা যুগ পরিবর্তনের ঈঙ্গিত দেয় তখনই কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর মাহেদ্রক্ষণ। বাঙালি জাতির জীবনে সেই মাহেদ্রক্ষণ সর্বোচ্চ চ‚ড়া স্পর্শ করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। আর সেই চ‚ড়ার ওপর দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতির অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন— ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

হাজার বছর ধরে এই ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল বাঙালি। এজন্যই শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। কারণ তিনি বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নের এবং অন্তরের অন্তস্থলে গুমরে মরা স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন সেদিন। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো নেতা এমন ভয়ঙ্কর জটিল পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে এতো অকুতোভয়ে স্বাধীনতার কথা উচ্চারণের সাহস করেননি। এই নজিরবিহীন ঘটনার জন্যই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা; হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *