আল মামুন

বাঙালির শোকের দিন

বাঙালির শোকের দিন

১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। অন্য আর দশটি সাধারণ দিনের মতোই একটা দিন। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাত আটটা নাগাদ তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ফেরেন। পরদিন ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা তাঁর। রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক-কর্মচারীগণ তুমুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে সম্পন্ন করেছে বর্ণাঢ্য আয়োজন। কিন্তু সেই সমাবর্তনে আর অংশ নেওয়া হয় না বঙ্গবন্ধুর। কারণ সেই রাত আর ভোর হয় না। খাওয়া-দাওয়া শেষে রাত আটটার মধ্যেই সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। সেই ঘুম ভাঙে ভোরে, বিকট গুলির শব্দে।

ঢাকা সেনানিবাসের বনানী মিলিটারি চেকপোস্ট দিয়ে ১২টি ট্রাকে সাঁজোয়া ও আর্টিলারি কামান নিয়ে বেরিয়ে আসে বিদ্রোহী সৈনিকরা। এক নম্বর দলটি পাঁচটি ট্রাক নিয়ে আসে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ভবনে শেখ মুজিবের বাসভবনের দিকে। দলের নেতৃত্বে ছিল মেজর নূর। দলে আরও ছিল মেজর বজলুল হুদা, মেজর মহিউদ্দিন (আর্মকোর), মেজর মহিউদ্দিন (আর্টিলারি) এবং ১২০ জন সৈন্য। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি পাহারা দিচ্ছিল প্রথম ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির সৈন্যরা। একসময় এই রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিল মেজর ডালিম এবং মেজর বজলুল হুদা ছিল অ্যাডজুট্যান্ট। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণ করে সেনাবাহিনীর বেঙ্গল ল্যান্সারের ফার্স্ট আর্মড ডিভিশন ও ৫৩৫ পদাতিক ডিভিশনের একটি দল। ঘাতকরা এদিন রচনা করে ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক একটি অধ্যায়। সেই রাতে সংঘটিত হয় সবচেয়ে জঘন্য এবং নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ড।

১৫ আগস্টের প্রথম প্রহর। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সব অফিসারদের এয়ারপোর্টের পাশে অবস্থিত হেডকোয়ার্টার স্কোয়ার্ডন অফিসে সমাপ্ত হতে নির্দেশ দেন মেজর ফারুক রহমান। এখান থেকেই তাদের দেওয়া হবে আক্রমণের চ‚ড়ান্ত ব্রিফিং। কমান্ডার মেজর ফারুক টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিল ঢাকা শহরের মানচিত্র। ফারুকের পরনে কালো ইউনিফর্ম, পিঠে ঝুলছে স্টেনগান, দৃঢ় চেহারা। তিনি তার অপারেশন অর্ডার শোনান উপস্থিত অফিসারদের। মনিচিত্রে টার্গেট চিহ্নিত করাই ছিল। আক্রমণের দায়িত্বে থাকবে তারই ইউনিটের বিশ্বস্ত অফিসার মেজর মহিউদ্দিন। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘিরে ধরা হবে, এরপর হবে আক্রমণ।

পরিকল্পনা মতে প্রথম আক্রমণ করা হবে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে, একইসঙ্গে আক্রমণ হবে শেখ ফজলুল হক মনি এবং সেরনিয়াবাতের বাসায়ও। বঙ্গবন্ধুর বাসার আক্রমণে উপস্থিত থাকতে বললেও পূর্ব সম্পর্কের অজুহাতে স্বেচ্ছায় সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণের দায়িত্বভার গ্রহণ করে মেজর ফারুক। গ্রæপ কমান্ডার মেজর ডালিমকে একটি হেভি মেশিনগান সংযোজিত দ্রæতগতির জিপ দেওয়া হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় প্রচুর অ্যামুনিশন, গুলি এবং এক প্লাটুন ল্যান্সারসহ একটি বড় ট্রাক। অপারেশন কমান্ডার মেজর ফারুক তার ট্যাংক বাহিনী নিয়ে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিহত করার দায়িত্ব স্বয়ং তার কাঁধে গ্রহণ করেন। ২৮টি ট্যাংক এবং ৩৫০ জন সৈনিক নিয়ে লড়বেন রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে। যদিও ট্যাংকের কামানের গোলা তার কাছে ছিল না। তবে তার ট্যাংকগুলোর মেশিনগুলোতে মজুদ ছিল পর্যাপ্ত গুলি। ডিসমন্টেড পদাতিক ট্রুপস ৩৫০ জন রাইফেলধারী সৈন্যকে সাজালেন রশিদের ইউনিট থেকে ধার নেওয়া ১২টি ট্রাকে। তারা মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে প্রধান টার্গেট আক্রমণে অংশ নেওয়া। আর মেজর রশিদের প্রধান কাজ ছিল অপারেশন পরবর্তী অবস্থার সামাল দেওয়া ও সার্বিক রাজনৈতিক সমন্বয় সাধন। সেই রাতের নির্মম রক্তঝরা অপারেশনের সার্বিক দায়িত্ব পালন করে বেঙ্গল ল্যান্সারের মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান।

রাত দেড়টায় আর্টিলারি ইউনিটের সৈনিকদের আবারও জড়ো করে সবাই উপস্থিত আছে কি না নিশ্চিত করা হয়। এরপর যৌথ ট্রেনিংয়ের নামে তাদের তিনটন লড়িতে ওঠার নির্দেশ এবং এক বেঙ্গল ল্যান্সার ইউনিট নিয়ে আসা হয়। রাত তিনটার কিছু পর উভয় ইউনিটের সৈনিকদের একত্রিত করা হয়। এরপর মেজর ফারুক, মেজর রশীদ, চাকরিচ্যুত মেজর ডালিম ও মেজর নূর যুদ্ধ পোশাকে সজ্জিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিষোদগার এবং তাঁর সরকার উৎখাতে শামিল হওয়ার আহ্বান জানায়। এসব অফিসারদের বক্তব্য শেষে এক বেঙ্গল ল্যান্সারদের পক্ষ থেকে সৈনিকদের গোলাবারুদ বন্টন করা হয়।

বিভিন্ন টার্গেটের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয় চাকরিরত ও চাকরিচ্যুত সব মিলিয়ে ১২ জন অফিসারকে। মেজর ফারুক, মেজর রশীদ এবং মেজর ডালিম আলাদা আলাদাভাবে টার্গেটগুলোর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব নেয়। রাত আনুমানিক চারটার সময়ে সেনানিবাস থেকে বের হয়ে আসে বেশ কিছু জিপ ও লরির একাধিক কনভয়। কিছুক্ষণ পরে ট্যাংকও অনুসরণ করে তাদের। যাত্রার সময়ই ঠিক করে নেওয়া হয়েছে সব টার্গেটে একই সঙ্গে আঘাত করা হবে। সেই মোতাবেক কনভয়ের প্রথম ভাগে মেজর ডালিমের নেতৃত্বে একটি জিপ ও এক ট্রাক সৈন্য মহাখালী-মগবাজার হয়ে দ্রুততম সময়ে মিন্টো রোডে পৌঁছে এবং কর্তব্যরত দুর্বল পুলিশি প্রহরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে।

মেজর রাশেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি দল ফার্মগেট-হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হয়ে সেরনিয়াবতের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলির বিকট শব্দে সবার ঘুম ভেঙে যায়। সেরনিয়াবত তখনই রাষ্ট্রপতিকে ফোন করেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ফোনে কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই মেজর রাশেদ, ক্যাপ্টেন মোস্তফা ও তাদের দল গুলি ছুড়তে ছুড়তে দরজা ভেঙে ঝড়ের বেগে দোতলায় উঠে যায়। মন্ত্রী ও তার পরিবার এবং কয়েকজন অতিথিকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নিয়ে আসে। এরপর লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে সাব-মেশিন (এসএমসি) ট্রিগার চেপে ধরে। গুলির শব্দ এবং মানুষের আর্তচিৎকারে যেনো কেঁপে ওঠে আকাশ-মাটি। ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি চার বছরের ছোট্ট শিশু সুকান্ত বাবুও।

ঠিক একই সময়ে ধানমন্ডিতে যুবনেতা শেখ মনির বাসায় আক্রমণ চালায় মেজর আজিজ পাশা, রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের গ্রুপ। এরা বিনা বাধায় বাড়ির দোতলায় উঠে শেখ মনি ও তার আন্তঃস্বত্তা স্ত্রীকে হত্যা করে ভাবলেশহীনভাবে বেরিয়ে যায়।

তৃতীয় দলটির টার্গেট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি। এখানেই সপরিবারে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রহরায় থাকায় এখানে আক্রমণ করা ঘাতকদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। তাই তারা শক্ত পরিকল্পনা নিয়ে সামনে আগায়। পরিকল্পনাকারী আর্টিলারি মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি অংশ লেকের অপর পাড়ে মর্টার ও ভারি মেশিনগান নিয়ে, মেজর মহিউদ্দিন ল্যান্সার গ্রুপ ৩২ নম্বর রোড ধানমন্ডির পশ্চিম প্রান্তে মেজর নূর ও ক্যাপ্টেন বজলু ৩২ নম্বর রোডের প্রবেশমুখে মিরপুর রোডে অবস্থান গ্রহণ করে। আরেকটি দলকে রাখা হয় ৩১ নম্বর রোডে। যেনো কেউ পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। ফার্মগেটে ট্যাংক নিয়ে মেজর ফারুক ওয়্যারলেস সেটের মাধ্যমে তত্ত্বাবধান করতে থাকে। কয়েকটি ট্যাংক রেডিওস্টেশন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও এর আশপাশে অবস্থান নেয়। তখন ভোর আনুমানিক সাড়ে পাঁচটা। এ সময় ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা শুরু হয়ে যায়। প্রথমে গেটে ঢুকতে গিয়েই গোলাগুলির সূত্রপাত হয়। পরে তা প্রবল আকার ধারণ করে। বঙ্গবন্ধু ফায়ারিংয়ের শব্দে জেগে উঠে কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রথমে টেলিফোন করেন রক্ষী বাহিনীর সদর দপ্তরে। রক্ষী বাহিনীর প্রধান তখন দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কেউ ফোন ধরছিল না। তিনি তাঁর মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল জামিল উদ্দিনকে ফোনে পেয়েছিলেন। তাকে বলেন, ‘জামিল তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোক আমার বাসা আক্রমণ করেছে। শফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো।’

জামিল ফোন পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে তার লাল প্রাইভেটকার হাঁকিয়ে ছুটে যান ৩২ নম্বর রোডে। কিন্তু তিনি সৈন্যদের গুলিতে বাসার কাছেই নিহত হন।

বঙ্গবন্ধু ফোন করেন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর শফিউল্লাহকেও। তাকে লাইনে পেয়ে শেখ মুজিব বলেন, ‘আমার বাড়ি আক্রমণ হয়েছে, কামালকে মনে হয় মেরে ফেলেছে। তুমি ফোর্স পাঠাও। মন্ত্রী এবং ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবতকেও। টেলিফোন করে তার বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ জানান। শফিউল্লাহ বলেন, ‘স্যার, ক্যান ইউ গেট আউট, আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং।’

শফিউল্লাহ ফোনে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান। তখন আনুমানিক ভোর পাঁচটা ৫০মিনিট। শফিউল্লাহ বিভিন্ন দিকে ফোন করতে থাকেন। প্রথমেই তিনি ফোন করেন ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়েত জামিলকে। তাকে প্রথম বেঙ্গল ও চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট মুভ করতে বলেন। শফিউল্লাহ অবশ্য শাফায়েত জামিলকে বেশ কিছুক্ষণ আগেই সোয়া পাঁচটার দিকেই ট্রুপস মুভ করতে বলেছিলেন। কারণ ধানমন্ডির দিকে ট্যাংক মুভমেন্টের খবর তিনি আনুমানিক পাঁচটার দিকে গোয়েন্দা প্রধান কর্নেল সালাহউদ্দিনের মাধ্যমে জানতে পারেন। কিন্তু তার নির্দেশ সত্ত্বেও তখন কোনো অ্যাকশন নেয়নি শাফায়াত জামিল। অন্যদিকে জামিল বলেছে, ‘শফিউল্লাহ আমাকে কোনো নির্দেশ দেননি। তিনি শুধু বিড়বিড় করেছেন, কেঁদেছেন, কোনো অ্যাকশন নিতে বলেননি।’

শেখ সাহেবের ফোন পাওয়ার পর আবার তিনি শাফায়েতকে ফোন করেন। কিন্তু তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি। ফোনের রিসিভার তুলে রাখা হয়েছিল। অগত্যা শফিউল্লাহ খালেদ মোশাররফকে ফোন করে বাসায় চলে আসতে বলেন। খালেদ পায়জামা পরেই তার গাড়ি নিয়ে ছুটে আসেন। শফিউল্লাহ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে ৪৬ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে পাঠালেন শাফায়েত জামিলকে দেখতে, সে কি করছে। শফিউল্লাহও বুঝতে পারছিলেন না ৪৬ ব্রিগেড থেকে কোন কোন ট্রুপ মুভ করছে না। যদিও তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এরপর শফিউল্লাহ এয়ার চিফ, নেভাল চিফ এবং জিয়াউর রহমানকে উদভ্রান্তের মতো ফোন করতে থাকেন। তবে তার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রপতির সাহায্যার্থে একটি সেনাও তিনি মুভ করাতে পারেন না। এরপর সকাল ছয়টার সময় রেডিও বাংলাদেশে মেজর ডালিমের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে— ‘স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’

বাড়ির নিতলায় কাউকে না পেয়ে মেজর মহিউদ্দিন (আর্মকোর) মেজর বজলুল হুদা কয়েকজন সৈন্যসহ সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে থাকে। ওপরে উঠে দেখেন সিঁড়ির মাথায় আছেন শেখ মুজিব। তিনি হুঙ্কার দিয়ে জানতে— ‘তোরা কী চাস? কামাল কোথায়?’ বজলুল হুদা বলে— ‘কামাল তার জায়গায় আছে। আপনি আমাদের হাতে বন্দি।’ বঙ্গবন্ধু এবার গর্জে উঠলেন— ‘কী বললি! এতো বড় সাহস তোদের? পাকিস্তান আর্মি আমাকে মারতে পারেনি, তোরা কে?’ মেজর হুদা আবার বলে— ‘আপনি বন্দি।’ এবার শেখ মুজিবের গলার স্বর নরম হয়ে আসে— ‘তোরা বঙ্গবন্ধুকে এভাবে নিয়ে যেতে চাস? আমার তামাক পাইপটা নিতে দে।’ একথা বলেই তিনি তাঁর শয়ন কক্ষে প্রবেশ করেন। মেজর হুদা তাঁর পিছু পিছু কক্ষে প্রবেশ করে। এতে শেখ মুজিব রেগে যান— ‘তোর এতো বড় সাহস বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরে ঢুকিস!’ বজলুল তখন বলে— ‘যে কাপড় পরা আছে সেই কাপড়েই চলুন।’ মেজর মহিউদ্দিন বলে— ‘স্যার আপনি আসুন।’ বঙ্গবন্ধুর পরনে তখন ধূসর বর্ণের চেক লুঙ্গি এবং সাদা পাঞ্জাবি। ধূমপানের পাইপটি ডান হাতে। তারা যখন নিচে নামছে তখন সিঁড়ির নিচে থেকে মেজর নূর চিৎকার করে ইংরেজিতে বলে— ‘হুদা, তোমরা সময় নষ্ট করছো কেনো?’

শেখ মনিকে হত্যা করে এরই মধ্যে ফিরে এসেছে সুবেদার মোসলেম উদ্দিন। বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ্য করে প্রথম সেইই গুলি ছোড়ে। বঙ্গবন্ধু থমকে দাঁড়ান। তারপর ঢলে পড়েন সিঁড়ির ওপর। পড়ে যাওয়া দেহের ওপর চলে স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ার। সময় তখন পাঁচটা ৪০মিনিট। মসজিদে আজান দিচ্ছিল মুয়াজ্জিন।

এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও একে একে ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্নেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক।

১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটির বর্ণনা দিয়ে ঢাকা স্টেশনের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ পিএসসি তাঁর ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান এবং না বলা কিছু কথা’ বইয়ে লিখেছেন— ‘…দু-তলায় উঠতে পা বাড়ালাম। সিঁড়ির মুখেই চমকে উঠলাম। সিঁড়িতেই দেখি পড়ে আছেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি এবং চেক লুঙ্গি। পাশে পড়ে আছে তাঁর ভাঙা চশমা। তাঁর দেহ সিঁড়ির ওপর এমনভাবে পড়েছিল। যেনো মনে হচ্ছিল সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেছেন। কারণ তাঁর মুখে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। চেহারা ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তাঁর বুকের অংশটুকু ছিল ভীষণভাবে রক্তাক্ত। মনে হলো ব্রাশ লেগেছে। তাঁর বাম হাতটা ছিল বুকের ওপর ভাঁজ করা, তবে তর্জনী আঙুলটা ছিঁড়ে গিয়ে চামড়ার টুকরার সাথে ঝুলে ছিল। তাঁর দেহের অন্য কোনো অঙ্গে তেমন কোনো আঘাত দেখিনি। সারা সিঁড়ি বেয়ে রক্তের বন্যা।’

১৫ আগস্ট সারাদিন ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটির গাড়ি বারান্দার এক কোণে বরফ ঢাকা কফিনে নিঃসঙ্গ পড়ে থাকে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ। বাকি ১৮ জনের লাশ ১৬ তারিখ রাতে বনানী গোরস্তানে দাফন করা হয়।

১৫ আগস্ট সন্ধ্যার পর সিদ্ধান্ত হয় বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়ায় দাফন করা হবে। ১৬ আগস্ট মেজর মহিউদ্দিন ও লে. সেকেন্দারসহ কয়েকজন সৈন্য হেলিকপ্টারে করে বিকাল তিনটার দিকে টুঙ্গিপাড়ায় নিজগ্রামে। সেখানে কফিন খোলা হয়। বঙ্গবন্ধুর সারাদেহ রক্তাক্ত। পরনে চেক লুঙ্গি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির নিচে সাদা গেঞ্জি, পকেটে পাইপ, কাঁচভাঙা চশমার ফ্রেম— সবকিছু রক্তে রঞ্জিত। সারা দেহে ২৯টি গুলির চিহ্ন। বুকে লেগেছে স্টেগানের ২৪টি গুলি। চোখের পাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে কানের পাশের রগ ছিঁড়ে গেছে। পায়ের গোড়ালিতে লেগেছে একটি গুলি। ডান হাতের তর্জনী ও বাঁ হাতের অনামিকায় গুলি লাগে। পাকস্থলীর কিছু অংশ বের হয়ে গিয়েছিল। চোখ দু’টো বন্ধ। চেহারা ছিল অবিকল।

বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ নিজবাড়ির আঙিনায় হোগলার চাটাইয়ে শুইয়ে শেষ গোসল করানো হয়। এরপর মাত্র ১০জনের উপস্থিতিতে জানাজা পড়ান মৌলভী শেখ আব্দুল হাকিম। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মের পর যে গ্রামের আলো-বাতাস, মাটি ও মানুষের সঙ্গে কাটান জীবনের ২২টি বছর, সেই গ্রামের মাটিতেই ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট চিরনিদ্রায় শায়িত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *