আল মামুন

আপন আলোয় ফেরা

আপন আলোয় ফেরা

১০ জানুয়ারি ১৯৭২। পৌষের শীত উপেক্ষা করে সকাল থেকেই তেজগাঁও বিমানবন্দরে লাখো মানুষ জমায়েত হয়। দুপুর পর্যন্ত অধীর হয়ে প্রাণপ্রিয় নেতার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে তারা।

সাধারণ মানুষদের সাথে বিমানবন্দরে আরও অপেক্ষায় ছিলেন— প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, জননেতা তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আ. স. ম. আবদুর রব, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানী। ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান। ফুল হাতে আদরের ছোট ছেলে শেখ রাসেলসহ শেখ কামাল ও শেখ জামালও অপেক্ষায় ছিলেন তাদের বাবার জন্য।

দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে। ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সাদা কমেট বিমান এসে ল্যান্ড করে তেজগাঁও এয়ারপোর্টে। বিমানের দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন সেই চিরচেনা অতি আপন মানুষটি। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। বঙ্গবন্ধু হাতে তুলে অভিবাদন জানান তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে আসা লাখো মানুষকে।

বিমানের সিঁড়ির মুখে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ। তাদের ডিঙিয়ে দৌঁড়ে উপরে উঠে কয়েকজন যুবক তীব্র আনন্দে বঙ্গবন্ধুকে ঝাঁপটে ধরে। বিমান থেকে নেমে জনসমুদ্রে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়া মানুষদের দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলেন বঙ্গবন্ধু।

বাঙালি ও বিশ্বজনমতের প্রবল চাপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। একই দিনে ড. কামালও মুক্তি পান। বঙ্গবন্ধু পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে বেলা ১২টা ৩৫ মিনিটে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। এরপর ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে বঙ্গবন্ধুকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ।

৮ জানুয়ারি লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘আজ আমি মুক্ত। আমার প্রিয় দেশবাসীর সঙ্গে স্বাধীনতার সীমাহীন আনন্দ-উৎসবে অংশগ্রহণ করেছি। আমরা এক মহাকাব্যের ন্যায় মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। সংগ্রাম শেষ, অর্জন হলো একটি স্বাধীন-সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। আমি যখন একটি কনডেমড সেলে ফাঁসির কাষ্ঠে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের অপেক্ষায় ছিলাম; তখন আমার দেশবাসী আমাকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। যে সকল স্বাধীনতাপ্রিয় দেশ আমাদের জাতীয় সংগ্রামের সমর্থন প্রদান করেছে, তাদের আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি সকল দেশকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, আমাদের সঙ্গে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং জাতিসংঘে অবিলম্বে সদস্যপদ লাভের জন্য সমর্থন প্রদানের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’

১০ জানুয়ারি ড. কামাল হোসেনসহ লন্ডন থেকে দিল্লি পৌঁছেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে পালাম বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর দিল্লির প্যারেড গ্রাউন্ডে বিশাল জনসমাবেশে বাংলায় এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। সেখান থেকে দুপুর একটা ৪১ মিনিটে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল রেসকোর্স ময়দানে। এই রেসকোর্স ময়দানেই এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল অপরাহ্নে তিনি ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার। কিন্তু যাঁকে আর ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিল বাঙালি, তাঁকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় সবাই। ফলে বঙ্গবন্ধু অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যাওয়াই হয়ে উঠল কঠিন।

চারদিকে মানুষ আর মানুষ। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানে আসতে সময় লেগেছিল প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা। খোলা জিপগাড়িতে বঙ্গবন্ধু। গাড়িতে তাঁর বামপাশে দাঁড়ানো অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ডান পাশে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ। তাঁকে ঘিরে আরও জনাবিশেক মানুষ। রাস্তার দু’পাশে ভিড় উপচে দাঁড়ানো অজস্র মানুষ, বাড়ির ছাদে-গাছের ডালে, হৃদয়ের গভীর থেকে সমস্বরে সবাই স্লোগান দিতে থাকে— শেখ মুজিব জিন্দাবাদ, শেখ মুজিব জিন্দাবাদ। অবশেষে তিনি পৌঁছলেন রেসকোর্স ময়দানে। সংবর্ধনা জানানোর মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল পাঁচ শ’ ফুট দীর্ঘ একটি নৌকার আদলে। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে পৌঁছলে ছাত্ররা তাঁকে ব্যূহের মতো বেষ্টন করে নিয়ে আসে মঞ্চের কাছে। মঞ্চে ওঠেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর এটিই প্রথম জনসভা। দীর্ঘ নয় মাসের লড়াই শেষে তিনি জনতার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন, রুমালে মুচলেন চোখ। তারপর লাখো জনতার সামনে দিক নির্দেশনামূলক নাতিদীর্ঘ এক ভাষণ দেন। সে ভাষণের উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে তুলে ধরা হলো—

‘আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারবো না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যে ভাবে সংগ্রাম করেছে আমি কারাগারে বন্দী ছিলাম, ফাঁসি কাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালিকে দাবায় রাখতে পারবে না। আমি আমার সেই যেই ভাইয়েরা জীবন দিয়েছে তাদের আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম। বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই। আমার সোনার বাংলা, তোমায় আমি বড় ভালোবাসি। বোধহয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।

আমি আশা করি দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন আমার রাস্তা নাই আমার ঘাট নাই, আমার খাবার নাই, আমার জনগণ গৃহহারা সর্বহারা,আমার মানুষ পথের ভিখারী। তোমরা আমার মানুষকে সাহায্য করো মানবতার খাতিরে তোমাদের কাছে আমি সাহায্য চাই। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রের কাছে আমি সাহায্য চাই। তোমরা আমার বাংলাদেশকে তোমরা রিকোগনাইজ করো। জাতিসংঘের ত্রাণ দাও, দিতে হবে। উপায় নাই, দিতে হবে। আমি আমরা হার মানবো না। আমরা হার মানতে জানি না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন— ‘সাত কোটি বাঙ্গালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করো নাই।’

কবিগুরু আজ মিথ্যা কথা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ। আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে এতো লোক আত্মাহুতি, এতো লোক জান দেয় নাই। তাই আমি বলি আমায় দাবায় রাখতে পারবা না।

আজ থেকে আমার অনুরোধ আজ থেকে আমার আদেশ আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়। আমি তোমাদের ভাই তোমরা আমার ভাই। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের যুবক যারা আছে তারা চাকরি না পায়। মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ তোমাদের মোবারকবাদ জানাই তোমরা গেরিলা হয়েছো তোমরা রক্ত দিয়েছো, রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় নাই।

একটা কথা আজ থেকে বাংলায় যেন আর চুরি ডাকাতি না হয়। বাংলায় যেন আর লুটতরাজ না হয়। বাংলায় যারা অন্য লোক আছে অন্য দেশের লোক, পশ্চিম পাকিস্তানের লোক বাংলায় কথা বলে না তাদের বলছি তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। আর আমি আমার ভাইদের বলছি, তাদের উপর হাত তুলো না। আমরা মানুষ, মানুষ ভালোবাসি।

আজ আমি যখন এখানে নামছি, আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই। যে মাটিকে আমি এতো ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এতো ভালোবাসি, যে জাতকে আমি এতো ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।

ক্ষমা করো আমার ভাইয়েরা ক্ষমা করো আজ আমার কারো বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাই একটা মানুষকে তোমরা কিছু বলো না অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দিবো আইন নিজের হাতে তুলে নিও না।

নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা। বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হয়ে বাস করবে। বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে— এই আমার সাধনা, এই আমার জীবনের কাম্য। আমি যেনো এই কথা চিন্তা করেই মরতে পারি এই আশীর্বাদ এই দোয়া আপনার আমাকে করবেন।

ইনশাল্লাহ স্বাধীন যখন হয়েছি স্বাধীন থাকবো। একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে এই সংগ্রাম চলবে।’

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *