আল মামুন

ফাঁসির অপেক্ষায় বঙ্গবন্ধু

ফাঁসির অপেক্ষায় বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যাওয়ার পর লয়ালপুরের (বর্তমান নাম ফয়সালাবাদ) কারাগারে রাখা হয়। কারাগারের একটি অন্ধকার ঘরে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তাঁকে কোনোভাবেই জানতে দেওয়া হয়নি যে তিনি পাকিস্তানের কোন কারাগারে আছেন। কারাগারের অন্ধকার ঘরে থাকতে থাকতে দিন-রাতের ফারাকটা ভুলে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এভাবে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়সহ তারপর আরও ২৮৯ দিন কারাগারে রাখা হয়েছিল। বাইরের জগত থেকে তিনি সম্পূর্ণই বিচ্ছিন্ন ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর রেডিও অস্ট্রেলিয়াকে এক সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া খান বলল, ‘শেখকে মরতেই হবে।’

কারাগারে থাকাকালে বঙ্গবন্ধুকে কোনো সংবাদপত্র পড়তে বা রেডিও শুনতে দেওয়া হয়নি। কারারক্ষীদের প্রতিও ইয়াহিয়া সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল যেনো তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা না বলেন। এমনকি বাহির থেকেও কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারতেন না, চিঠি দিতে পারতেন না। দেশের খবর কী কিংবা মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে চলছে— সেসব খবরও জানার সুযোগ ছিল না বঙ্গবন্ধুর। দুঃসহ যন্ত্রণায় কেটেছে তাঁর কারাগারের দিনগুলো। একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ পেতেন এবং একজন বাঙালি রাঁধুনির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যিনি বাঙালি খাবার রান্না করে দিতেন।

১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান্টক্লিমেন্টের সিনিয়র বিভিন্ন গ্রুপের বৈঠক বসে। এখানে কিসিঞ্জারের প্রশ্ন— ‘মুজিব কোথায়? সিআইএর কর্মকর্তা ডেভিড ব্লি বললেন— তাঁকে আটক করা হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, তিনি সম্ভবত পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় আছেন।’

পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড ৮ এপ্রিল স্টেট ডিপার্টমেন্টকে জানান, শেখ মুজিবকে হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানের ফোর্টে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ২২ মে করাচিতে ফারল্যান্ডকে ইয়াহিয়া বলেন, ‘আমি মনে করি। শেখ মুজিব মহা অপরাধ করেছেন। সাংবিধানিক আদালতে তাঁর বিচার হবে। তবে বিচার হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ।’ এরপর ফারল্যান্ড তাকে বলেন, ‘শেখ মুজিবের প্রতি ব্যাপক মাত্রায় আন্তর্জাতিক সহানুভ‚তি রয়েছে। কাজেই তাঁকে দণ্ড দেওয়ার মতো বিষয়ে পাকিস্তানের উচিত হবে বিশ্বজনমতকে গুরুত্ব দেওয়া।’ এ কথা শুনে চুপ হয়ে যান ইয়াহিয়া খান।

এর দুইদিন পর, ২৪ মে করাচিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে ইয়াহিয়া বলেন, ‘পাকিস্তান সরকার যেভাবে যথাযথ মনে করবে, তার সম্পর্কে সে রকমই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এরপর ১১ জুলাই ইয়াহিয়া আবার বলেন, ‘বাঙালি নেতা পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে সুস্থ ও জীবিত রয়েছেন। তবে আজকের পরে কাল শেখ মুজিবের কপালে কী ঘটবে, তা বলতে পারবো না। বিচার করা হবে এবং এই নয় যে আগামীকালই তাঁকে গুলি করবো। স্বাভাবিক মৃত্যুও তো হতে পারে। সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার করার জন্য আমার জেনারেল চাপ দিচ্ছেন। খুব দ্রুত বিচার অনুষ্ঠিত হবে।’

‘১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই লন্ডনের ‘দি ফিনান্সিয়াল টাইমস এর সংবাদ থেকে বিশ্ববাসী জানতে পারে, জেনারেল ইয়াহিয়া খান অত্যন্ত গোপনে বঙ্গবন্ধুর বিচারের ব্যবস্থা করেছেন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে।

১১ আগস্ট শুরু হয় প্রহসনের বিচার। কারাগারের পাশেই ছোট্ট একটি বাড়িতে করা হয় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। সকাল ১০টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত শুনানি চলতো। কিন্তু এ সময় বঙ্গবন্ধু থাকতেন নিশ্চুপ। খুব প্রয়োজন না হলে তিনি কথা বলতেন না। কয়েকদিন পর তাঁকে আদালতের বিবরণী দেওয়া হলে বিবরণী বইয়ের ওপর লেখেন— ‘সব মিথ্যা।’ কয়েকদিন পর আবার বিবরণী বই দেখতে দেওয়া হলে এবার লিখলেন, ‘কাকে বলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা?’

প্রহসনের বিচার অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার, দুজন কর্নেল, একজন ইউং কমান্ডার, একজন নেভাল কমোডর ও একজন জেলা জজ।

ইয়াহিয়া সরকারের ১২ অভিযোগে তোলা মামলা চলে ছয় মাস। ১২টি মামলার ছয়টিতেই শাস্তি ‘মৃত্যুদন্ড’। ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মামলায় ১০৫ জন ব্যক্তি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন। শেখ মুজিবকে যেনো কোনোভাবেই ফাঁসি না দেওয়া হয় সেজন্য ইয়াহিয়া খানকে চাপ দিতে থাকে বিশ্বনের্তৃবৃন্দ। এই বিশ্বজনমক গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এমনকি পাকিস্তানের অনেক মানুষ চাননি যে তাদের প্রিয় ‘শেখ সাহেব’ এর কোনো ক্ষতি হোক।

৫ নভেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্স সংবাদ প্রকাশ করে, পাকিস্তানের বিভিন্ন স্তরের ৪২ ব্যক্তি সম্মিলিতভাবে একটি আবেদনপত্রে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের কাছে শেখ মুজিবের দ্রুত এবং নিঃশর্ত মুক্তির আবেদন জানায়। এর মধ্যে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখক, ছাত্র নেতা, সমাজকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী।

ইয়াহিয়া সরকারের গোপন বিচারব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বময় ঝড় ওঠে। বিচার শুরুর আগে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট নিজের উদ্বেগের কথা জানান। একে ‘বিবেকের বন্দি’ বলে ঘোষণা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বিচারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল পাশ্চাত্যের জুরি কমিশনও। শেখ মুজিবকে যেনো বিচারের নামে মৃত্যুদন্ড না দিতে পারে সেজন্য কয়েকটি হুঁশিয়ারি দেয় দেশ। ১৯৭১ এর সেপ্টেম্বরে স্টেট ডিপার্টমেন্টকে গোপন বার্তায় পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড লিখলেন— ‘আমরা ব্যক্তিগত আশ্বাস পেয়েছি যে মুজিবকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে না।’ কিন্তু ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বের প্রহসনের আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করে। তবে বরাবরের মতোই এ ঘোষণা শুনে বঙ্গবন্ধু শান্ত ছিলেন। শুধু সামরিক কর্মকর্তাদের এটুকু বলেছিলেন— ‘আমার কবরটা যেনো বাংলাদেশে হয়।’

এরই মধ্যে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। স্বাধীন হওয়ার চার দিন পরই ইয়াহিয়া খান ‘রাষ্ট্রপতি’ পদ ছাড়তে বাধ্য হন। ২০ ডিসেম্বর নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো। দায়িত্ব নেওয়ার পারদিন তিনি বললেন— ‘শেখ মুজিবকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে গৃহবন্দী করে রাখা হবে।’

২২ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নিক্সন এক বার্তায় বলেন, ‘শেখ মুজিবকে দ্রুতই মুক্তি দেওয়া হবে।’

২৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে রাওয়ালপিন্ডির বাইরে সিহালা অতিথি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন তাঁর সঙ্গে গোপনে দেখা করেন ভুট্টো। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়— ‘আমি ভেবেছিলাম, আরেকটা দুর্যোগ বোধ হয় নেমে এসেছে।… প্রথমেই জানতে চাইলাম, কীভাবে এলেন? ভুট্টো বললেন, ‘আমি এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। বঙ্গবন্ধু তাকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার বাংলার অবস্থা কী? তা বলুন। খুবই বিচলিত হয়ে আছি আমি।’ ভূট্টো বললেন, ‘সোভিয়েত নৌ এবং বিমানবাহিনীর সাহায্য নিয়ে ঢাকা দখল করে নিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। বেশ উদ্বিগ্ন বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তার মানে ওরা আমার লোকদের হত্যা করেছে! আপনি আমাকে দ্রুত ঢাকায় যাবার ব্যবস্থা করুন।’ বঙ্গবন্ধুর কাছে নিশ্চয়তা চেয়ে ভুট্টো বললেন, ‘পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনে আপনার সাহায্য দরকার, আমরা একসঙ্গে থাকবো, তার কি কোনো সম্ভাবনা নেই?’

বঙ্গবন্ধু আপোস করলেন না। তিনি বললেন, ‘আমার জনগণের সঙ্গে কথা না বলে আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারবো না। আগে আমি ফিরে যাই, তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলবো।’

১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি ভুট্টো আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁকে দলে টানতে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। ইয়াহিয়ার জন্য টুকরো হওয়া পাকিস্তানকে একসঙ্গে করে দেশের ত্রাণকর্তা হওয়াই উদ্দেশ্য ভুট্টোর। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বললেন, দুই দেশের মধ্যে কনফেডারেশনের ব্যবস্থা কি করা যায় না? বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘না, তা আর কোনো দিনই সম্ভব নয়।’

৮ জানুয়ারি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের খবর পৌঁছে গেছে। বিবিসি সংবাদ প্রচার করছে— ‘বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন পৌঁছে গেছেন।’

বঙ্গবন্ধু লন্ডন এসে উঠলেন ক্ল্যারিজেস হোটেলে। ঢাকা থেকে ফোন করে কথা বললেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, বেগম মুজিব। ভারতের লক্ষ্মৌ থেকে ফোন করলেন ইন্দিরা গান্ধী। এরপর লন্ডন থেকে ভারত হয়ে পাকিস্তানে কারাবন্দি জীবন থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরলেন বঙ্গবন্ধু।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *