আল মামুন

যেভাবে হলো স্বাধীনতার ঘোষণা

যেভাবে হলো স্বাধীনতার ঘোষণা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বিকেলের দিকেই বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন যে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে এবং পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছে। তখন তিনি তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু নিজে তাঁর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান।

এ রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিত গুলি ছুড়তে ছুড়তে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং গভীর রাতে তাঁকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগেই তিনি টিএন্ডটি ও ইপিআর এর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে স্বাধীনতার ঘোষণা পৌঁছে দেন। ইংরেজিতে লেখা স্বাধীনতার ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. New York Times, 16th January, 1972.

‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পরবর্তীকালে বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার করা হয়। বাংলা অনুবাদ— ‘এটাই হয়তো আমার শেষবার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। যে যেখানে থাকুন সকলের প্রতি আমার আবেদন রইল, যার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে দখলদার বাহিনীর মোকাবেলা করুন। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করে চ‚ড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুকর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে ১৯৭১ সালে জাতীয় পরিষদে বিতর্ক দেখা দেয়। অথচ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে উল্লেখ করেছেন— ‘রাত ১২টা ২০ মিনিটে যখন টিক্কা খানের সঙ্গে বসেছিলেন, তখন ওয়্যারলেসে ভেসে আসছিল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা।’

বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতার বার্তাটি সে রাতেই আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীকে পৌঁছে দেয় চট্টগ্রাম ওয়্যারলেস বিভাগ। তিনি এবং চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এমএ হান্নান এ স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তার বাংলায় অনুবাদ করেন। সে রাতেই তা সাইক্লোস্টাইল করে চট্টগ্রাম শহরে জনগণের মধ্যে বিলি করে দেওয়া শুরু হয় এবং মাইকে তা প্রচার করা হয়। এরপর ২৬ মার্চ দুপুর পৌনে দুইটার সময় কালুরঘাট রেডিও ট্রান্সমিটার কেন্দ্র থেকে এমএ হান্নান স্বকণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এ সময় তার পাশে ছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয় তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য আতাউর রহমান খান কায়সার, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য মোশাররফ হোসেন এবং আওয়ামী লীগ নেতা ডা. আবু জাফর, আবদুল মান্নান প্রমুখ।

২৬ মার্চ সন্ধ্যা সাতটা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার ট্রান্সমিটার থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ নামে। যদিও চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ছিল আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায়। বন্দরে নোঙর করা পাক হানাদার বাহিনীর যুদ্ধ জাহাজের শেলিং এর আওতা থেকে নিরাপদ দূরে থাকার জন্য কালুরঘাট ট্রান্সমিটার সেন্টার থেকে অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র একজন সামরিক কর্মকর্তাকে দিয়ে পাঠ করানোর গুরুত্ব অনুধাবন করে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নের্তৃবৃন্দ। ওই সময় নিকটস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে পদমর্যাদায় সিনিয়র মেজর জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের জন্য অনুরোধ জানানো হয়। মেজর জিয়া ২৭ মার্চ কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যান। এরপর সন্ধ্যায় বেতার কেন্দ্রের দ্বিতীয় অধিবেশনে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ইংরেজিতে পাঠ করেন। তারপর ২৮ মার্চ এবং ৩০ মার্চ আবারও তিনি কালুরঘাট স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ৩০ মার্চ জিয়ার পাঠ করা স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে ঘোষণা করেন যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করছেন।

কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বকণ্ঠে পাঠ করা স্বাধীনতার ঘোষণাটি নিম্নরূপ—
‘On behalf of our great national leader, the supreme commander of Bangladesh Sheikh Mujibur Rahman do hereby proclaim the independence of Bangladesh. It is further proclaimed that Sheikh Mujibur Rahman is the solo leader of the elected representatives of 75 million people of Bangladesh. I therefore appeal on behalf of our great leader Sheikh Mujibur Rahman to the government of all the democratic countries of the world specially the big world part and neighboring countries to take effective steps to stop immediately the awful genocide that has been carried on by the army of occupation from Pakistan. The legally elected representatives of the majority of the people as repressionist. It is cruel joke and contradiction in terms which should be fool none. The guiding principle of a new step will be first neutrality, second peace and third friendship to all and anomity to none. May Allah help us. Joy Bangla.’

ভাষণটির বাংলা অনুবাদ—
‘আমাদের মহান নেতা, বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আমরা এতদ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং ঘোষণা করছি যে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ইতোমধ্যেই সরকার গঠিত হয়েছে। এতদ্বারা আরও ঘোষণা করা হচ্ছে যে, শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একমাত্র নেতা এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনগণের একমাত্র বৈধ সরকার, যা আইনসম্মত এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে গঠিত হয়েছে এবং যা পৃথিবীর সব সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।

অতএব আমি আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পৃথিবীর সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, বিশেষ করে বৃহৎ শক্তিবর্গ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের কাছে বাংলাদেশের বৈধ সরকারকে স্বীকৃতি দান এবং পাকিস্তানের দখলদার সামরিক বাহিনীকর্তৃক সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যাকে অবিলম্বে বন্ধ করার উদ্দেশ্যে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন জানাচ্ছি।

সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বৈধভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিবর্গকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা একটি নির্মম তামাশা এবং সত্যের বরখেলাপ মাত্র, যার দ্বারা কারও বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়।

নতুন রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হবে, প্রথম নিরপেক্ষতা, দ্বিতীয় শান্তি এবং তৃতীয় সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়। আল্লাহ আমাদের সহায় হউন। জয় বাংলা।’

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *