আল মামুন

বঙ্গবন্ধুকে যখন গ্রেফতার করা হলো

বঙ্গবন্ধুকে যখন গ্রেফতার করা হলো

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জামাদি ঢাকায় এসে পৌঁছা নিশ্চিত হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। এদিন সন্ধ্যায় কাউকে না জানিয়ে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান।

২৬ মার্চ রাত একটা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে হানা দেয় পাকিস্তানি বাহিনীর বিশেষ কমান্ডো দল। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জেড এ খান এবং মেজর বিলাল বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে নিয়ে আসে একটি ট্যাংক, একটি এপিসি এবং ট্রাক বোঝাই সৈন্য। বাড়ির গেটে পৌঁছাতেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা কিছুক্ষণ নির্বিচারে গুলি চালায়। এ সময় বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশকর্মী গুলিতে নিহত হন। গুলি জানালা দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। বিছানা থেকে উঠে যান বঙ্গবন্ধু। তিনি স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে বাথরুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর দোতলায় ব্যালকনিতে এসে যথাসম্ভব চেঁচিয়ে বলেন, ‘ফায়ারিং বন্ধ করো। কী চাও তোমরা? এসব করার কি কোনো দরকার ছিলো?’ এ সময় এক সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার, আমরা শুধু আদেশ পালন করছি।’

২৩ মার্চ কমান্ডো ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জহির আলম খানকে সকালে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আনা হয়। এদিন রাতেই তিনি কোম্পানি কমান্ডার মেজর বেলাল ও কোম্পানির দুই প্লাটুন কমান্ডার ক্যাপ্টেন হুমায়ুন ও ক্যাপ্টেন সাঈদকে নিয়ে বেসামরিক গাড়িতে করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি রেকি করতে যান। এরপর বেলা ১১টার সময় কর্নেল জহির খান মেজর জেনালে রাও ফরমান আলীর কাছে। ফরমান আলী কর্নেল জহিরকে ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার আদেশ দেয়। গ্রেফতারের আগে জেনারেল হামিদ বলেন, ‘গ্রেফতারের সময় শেখ মুজিবুর রহমানের গায়ে যেনো একটি আঁচড়ও না লাগে।’

বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় একজন সেনা কর্মকর্তা জেনারেল টিক্কা খানকে বলল, ‘স্যার, আপনার সামনে নিয়ে আসবো?’ উদ্যত টিক্কা বলল, ‘আমি ওর (বঙ্গবন্ধু) চেহারা দেখতে চাই না।’

সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা না দেখে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলো পাকিস্তানি বাহিনী। পরবর্তীতে গ্রেফতারের মুহূর্তের ঘটনা সম্পর্কে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বিদায় নিলাম স্ত্রীর কাছ থেকে। তিনি (স্ত্রী) একটি বাক্যও উচ্চারণ করলেন না। তাঁকে চুমু দিলাম, বিদায়ী চুম্বন। আমি বের হয়ে আসি। আমি বললাম, তোমরা এখন গোলাগুলি বন্ধ করতে পারো। তোমরা কী জন্য গুলি ছুড়ছো? এরপর তারা চারদিক থেকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমাকে আক্রমণ করতে। তখন হঠাৎ করে সেখানে উপস্থিত একজন অফিসার আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘একে হত্যা করো না।’ তারা আমাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করে। আমার মাথার পেছন দিকে দিয়ে বৃষ্টির মতো ঘুষি মারতে আরম্ভ করে। আমাকে আঘাত করে রাইফেলের বাঁট দিয়ে। তা ছাড়া তারা আমাকে এদিক-ওদিক ধাক্কা দিতে থাকে।’

রাত ১টা ৩০ মিনিটে ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর বেতারযন্ত্রেও মাধ্যমে অপারেশন সার্চলাইটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনাবাহিনীর সবাইকে এবং সেনা সদরে জানিয়ে দেয় যে, ‘বড় পাখিটি (বঙ্গবন্ধু) খাঁচায় পোরা হয়েছে, অন্যরা (আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতারা) নীড় ছেড়ে ভেগেছে।’

বঙ্গবন্ধুকে জীবিত অবস্থায়ই গ্রেফতারের নির্দেশ ছিলো ইয়াহিয়া খানের। তার নির্দেশ মতো বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় নির্মাণাধীন জাতীয় সংসদ ভবনে। সেখানে এক ঘণ্টা রেখে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের গোপন ডেরায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন নেওয়া হয় ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউসে।

শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের পর এক জায়গায় বেশিক্ষণ রাখা হয়নি। এর কারণ, পাকিস্তানি বাহিনী ভয়ে ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানোর উদ্যোগ দুবার ব্যর্থ হয়। মধ্য আকাশে ভারতীয় বিমানবাহিনী ধাওয়া করতে পারে— এই আশঙ্কা ছিলো তাদের। অবশেষে গ্রেফতারের তিন দিন পর একটি বিমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে আকাশে উড়াল দেয়।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *