আল মামুন

বাঙালি হত্যার নীল নকশা

বাঙালি হত্যার নীল নকশা

শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ ঢাকায় আসে ইয়াহিয়া খান। ১৬ মার্চ থেকে একের পর এক বৈঠক হয় তাদের দুজনের মধ্যে। একই সঙ্গে আলোচনার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টোও আসেন ঢাকায়। পরবর্তীতে তিনি ও শীর্ষস্থানীয় পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা অংশগ্রহণ করেন এ আলোচনায়। ত্রিপক্ষীয় আলোচনা চলে ২৪ মার্চ পর্যন্ত।

আলোচনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অসহযোগ আন্দোলনও চলতে থাকে। কিন্তু আলোচনা দীর্ঘায়িত করে এ সুযোগে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং সামরিক সরঞ্জাম গোপনে আনার কাজটি সম্পন্ন করে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো।

১৭ মার্চ সামরিক বৈঠকে বাঙালি হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। ইয়াহিয়া খান গোপনে টিক্কা খানকে বলে, ‘বাস্টার্ড (শেখ মুজিব) সঠিকভাবে চলছে না। তোমরা তৈরি হয়ে নাও।’ জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে ফোন করে টিক্কা খান বলে, ‘খাদিম তুমি তৈরি হতে পারো।’

স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের শায়েস্তা করার জন্য ‘অপারেশন ব্লিজ’ নামে একটি নীল নকশা তৈরি করে পাকিস্তানি জেনারেলরা। তবে ১৮ মার্চ জেনারেল খাদিম ও জেনারেল রাও ফরমান আলী ‘অপারেশন ব্লিজ’ পরিবর্তন করে নতুন পরিকল্পনা করে, আর এর নাম দেয় ‘অপারেশন সার্চলাইট।’ এই অপারেশনের সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের হাতে। ঢাকা শহর এবং এর আশপাশে অপারেশন পরিকল্পনার দায়িত্ব ছিল মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরবাবের ৫৭ ব্রিগেডের ওপর। কিন্তু ঢাকার মানুষ ইয়াহিয়া-ভুট্টোর শলাপরামর্শ এবং সেনাবাহিনীর সন্দেহজনক গতিবিধি আঁচ করতে পারে। ফলে উত্তপ্ত হতে থাকে ঢাকা শহর।

১৯ মার্চ জয়দেবপুরে সামরিক বাহিনী গুলিবর্ষণ ও কারফিউ জারি করে। ২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে উত্তোলিত হয় বাংলাদেশি পতাকা। স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এ দিনটি পালিত হয় ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে।

ইয়াহিয়া-ভুট্টোর বৈঠক ছিল কালক্ষেপণ মাত্র। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জামাদি এসে পৌঁছার পরপরই তাই ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় কোনো ঘোষণা ছাড়াই এবং কাউকে না জানিয়েই ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ছাড়ার আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোর আদেশ দিয়ে যান। তবে ঢাকা অবস্থানকালে এখানকার পরিস্থিতি দেখে ইয়াহিয়া বুঝে ফেলেন এই শহরের সবটুকু নিয়ন্ত্রণ এখন বাঙালিদের হাতে।
ইয়াহিয়ার নির্দেশে ২৫ মার্চের রাতে সমস্ত নরকীয় উন্মত্ততা নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তাদের আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স। আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তারা হামলা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপ্রিয় ও নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকদের ওপর হামলা চালাতে দ্বিধা করে না তারা। হলগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে অসংখ্য ছাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্) এর প্রধান কার্যালয় পিলখানা এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন অলিতে-গলিতে চালানো হয় ইতিহাসের ঘৃণিত ও বর্বরোচিত গণহত্যা।

ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। আগুন জ্বালিয়ে মানুষের সর্বস্ব ধ্বংস করে দেয়। এভাবে ২৫ মার্চের অতর্কিত হামলায় প্রায় ৫০ হাজার নর-নারীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।

২৫ মার্চের আগে পাকিস্তানের সব বাঘা বাঘা জেনারেল ঢাকায় এসে অবস্থান নেয়। এদের মধ্যে— জেনারেল ইয়াহিয়া, লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওমর, মেজর জেনারেল মিঠ্ঠা খান, মেজর জেনারেল পীরজাদা, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, ব্রিগেডিয়ার আরবাব উল্লেখযোগ্য। ঘনঘন গোপন সলাপরামর্শে বসে এসব জেনারেলরা। স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের দমন করার জন্য তৈরি করে নীল নকশা। তারা বুঝতে পেরেছিল স্বাধীনচেতা শেখ মুজিব কখনো মাথা নত করবে না।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *