আল মামুন

বিপুল বিজয়ের এক নির্বাচন

বিপুল বিজয়ের এক নির্বাচন

অনেক টালবাহানার পর আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন। ১৯৬৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দের গোলটেবিল বৈঠক হয়। বৈঠকে উদ্ভূত রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়ে ২৫ মার্চ সেনাবাহিনী প্রধান আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে পদত্যাগ করেন।

ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৮ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ নির্বাচন এবং প্রাদেশিক নির্বাচন ২২ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়।

১৯৭০ সালের ১ এপ্রিল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদ। ওই বছরের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে নৌকাকে বেছে নেয় আওয়ামী লীগ। ১৭ অক্টোবর ঢাকার ধোলাইখালে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করে আওয়ামী লীগ।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্লোগান ছিল— ‘জয় বাংলা’ আর ঘোষণাপত্রে ছিল ছয় দফা। নৌকার সমর্থনে গণজোয়ার তৈরি হয়। ২৮ অক্টোবর বেতার ও টেলিভিশনে ভাষণ দেন শেখ মুজিব। তিনি বলেন— ‘শুধু প্রধানমন্ত্রী কেনো, সারা দুনিয়ার ঐশ্বর্য আর ক্ষমতা আমার কাছে ঢেলে দিলেও আমি দেশের বিশেষ করে বাংলার বঞ্চিত মানুষের সাথে বেইমানি করতে পারবো না।’

নির্বাচনের জোয়ারে যখন সারা বাংলা উদ্বেল, তখন দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে প্রলয়ংকারী সামুদ্রিক ঝড়। এতে প্রায় ১০ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়। নির্বাচনী প্রচারণা ফেলে রেখে দুর্গত এলাকায় ছুটে যান শেখ মুজিব। তিনি দলের নেতাকর্মীদের উপদ্রুত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

ভয়াবহ ঝড়ে লাখ লাখ মানুষ মারা গেলেও রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া বা পশ্চিম পাকিস্তানের কেউ দেখতে আসেনি; দুর্গত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। ২৬ নভেম্বর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানি শাসকদের উদাসীনতার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

১৯৭০ সালের এ নির্বাচন ৫ অক্টোবর ও ২২ অক্টোবরের পরিবর্তে ৭ ডিসেম্বর ও ১৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। প্রলয়ংকারী ঝড়ের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি। এ নির্বাচনে অংশ নেয় মোট ২৫টি রাজনৈতিক দল। পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে।

নির্বাচনী প্রচারণায় পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরা হয়। সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের কথা তুলে ধরে ছয় দফার ভিত্তিতে ভোট চায় আওয়ামী লীগ।

নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মস্কোপন্থী ন্যাপ ও ওয়ালী ন্যাপ) সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং ছয় দফা ও ১১ দফা কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানায়। চীনাপন্থী ন্যাপ বা ভাসানী ন্যাপ ঘোষণা করে যে, সমাজতন্ত্রই মুক্তির একমাত্র পথ। ভাসানী বলেন, ‘ছয় দফা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্ত এবং এতে কৃষক-শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর কোনো পথ নেই।’

মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম— ধর্মভিত্তিক এবং উগ্র ডানপন্থী এসব দলগুলো ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের অখন্ডতার প্রশ্নে ‘গণভোট’ বলে প্রচার করে। এসব দল তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে সব সময় আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচিকে বিচ্ছিন্নতাবাদের নীল নকশা বলে প্রচার করতে থাকে।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো সাধারণ নির্বাচন। এ নির্বাচন ছিল পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অত্যন্ত সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১১টি রাজনৈতিক দল।

নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানি প্রদত্ত ভোটের হার ৫০.০৯ শতাংশ এবং সমগ্র পাকিস্তানের প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৫৭.৯৬ শতাংশ। নির্বাচনের ফলাফল দেখে চমকে যায় পাকিস্তানিরা। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। প্রাদেশিক ৩১০ আসনের মধ্যে জয়ী হয় ৩০৫ আসনে। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০ আসনে জয়লাভ করে।

পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৮.৭ শতাংশ আসন এবং প্রদত্ত ভোটের ৭৫.১১ শতাংশ ভোট লাভ করে। এর ফলে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ পরিষ্কারভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনী ফলাফল দেখে পাকিস্তানি আমলা, ব্যবসায়ী এবং সেনাবাহিনী আঁতকে ওঠে। শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র।

বিপুল বিজয়ের পর শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের জনগণ এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে। তারা এক অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের এ রায় প্রদানের অধিকার অর্জন করেছে।’

১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্সে ময়দানে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ছয় দফা বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করেন। শপথ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি দিয়ে। অনুষ্ঠানে শেখ মুজিব নিজে স্লোগান দেন— ‘আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ, জাগো জাগো, বাঙালি জাগো, জয় বাংলা।’

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *