আল মামুন

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার নিয়েছিল স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। সে কারণে ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি মুক্তি দিয়ে কারাগারের গেটে আনার পর আবার গ্রেফতার করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলার আসামি হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করা হয়। বাঙালি জাতির কণ্ঠ স্তব্ধ করাই এই মামলার উদ্দেশ্য ছিল।

আইয়ুব-মোনায়েম খানের স্বেচ্ছাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তখন পাকিস্তানের উভয় প্রদেশেই মিছিল, সমাবেশ, হরতাল নৈমিত্তিক বিষয় পরিণত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে। ১৪ জানুয়ারি ‘ঐতিহাসিক ১১ দফা’ ঘোষণা করা হয়। এরপর আরও দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলে আইয়ুব-মোনায়েম বিরোধী আন্দোলন।

১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এর ফলে স্বাধিকার আন্দোলন আরও তীব্র হয়। ছয় দফাকে নস্যাৎ করতে ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলা করে পাকিস্তানি শাসকেরা। এই মামলাকে কেন্দ্র করেই তখন উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলার ছাত্র-জনতা। পূর্ব পাকিস্তানে ২৪ জনুয়ারি স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়।

হরতাল-আন্দোলন চলাকালে ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিক ছাড়াও মকবুল, রোস্তম আলীসহ বেশ কয়েকজন পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন। এছাড়া ২৬ জানুয়ারি ঢাকার ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিতে মোট চারজন শাহাদাত বরণ করেন।

ক্যান্টনমেন্টে বন্দী থাকা অবস্থায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক ও সার্জেন্ট ফজলুল হকের ওপর গুলি চালানো হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি। ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন জহুরুল হক। এ ঘটনা জানাজানি হলে বিক্ষোভ ফেটে পড়ে ঢাকা শহর। শুধু ঢাকায়ই নয়— পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শহর এবং গ্রামের শ্রমিক, কৃষক ও নিম্নআয়ের পেশাজীবীসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের মধ্যে। আইয়ুব খানের পদত্যাগের দাবিতে পাকিস্তানে সকল অংশের মানুষ একযোগে পথে নামেন।

সার্জেন্ট জহুরুল হকের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে। জানাজা শেষে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে একটি মিছিল ‘জ্বালাও-পোড়াও’ ধ্বনি দিতে দিতে ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়ে তোলে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে থামাতে পুলিশ-ইপিআরের পাশাপাশি ১৪৪ ধারা জারি ও কারফিউ ঘোষণা করা হয়। সেনাবাহিনী যত্রতত্র গুলি চালায়। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালানো হয়।

অবাঙালি এক সেনা কর্মকর্তা বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে। এ হত্যাকান্ডের খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বিক্ষুব্ধ জনতা আক্রমণ করে বসে মুসলিম লীগের অনেক নেতার বাড়ি। দুর্বার বাঙালির আক্রমণের লক্ষ্য তখন ঢাকা সেনানিবাস।

আগরতলা মামলার বিচারক তার অস্থায়ী বাসভবন থেকে এক কাপড়ে পালিয়ে তেজগাঁও এয়ারপোর্টে চলে আসেন। পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যখন হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও এ বিদ্রোহ দমন করা যাচ্ছিল না, তখন ১৮ ফেব্রুয়ারি জোরদার কারফিউ বলবৎ করা হয়। তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ-ডাকসু’র ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে কারফিউ ভেঙে মিছিল নেমে আসে রাজপথে। ১৪৪ ধারা ভাঙার ঘোষণা দেওয়া হয় ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি। এর প্রতিবাদে কর্মসূচি দেওয়া হয় ১৮ জানুয়ারি। সেই কর্মসূচিতেও হামলা চালানো হয়। প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি মিছিল করা হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। পরবর্তীতে যিনি শহীদ আসাদ নামে পরিচিতি পান।

পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন আসাদ। তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে কর্মসূচি দেওয়া হয়। আসাদের মৃত্যুর পর আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে ওঠে। আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

২১ জানুয়ারি পল্টনে এক সমাবেশে ২২ থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত পরবর্তী তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সেখানে ছিলেন মওলানা ভাসানী এবং আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ২২ তারিখ প্রতিটি বাড়িতে কালো পতাকা টাঙানো হয়। ২৩ তারিখ সন্ধ্যার পর হয় স্মরণকালের বৃহত্তম মশাল মিছিল। এরপর ২৪ জানুয়ারি পালিত হয় হরতাল।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি রেডিওতে ঘোষণা দেন— ‘আমি আর নির্বাচনে দাঁড়াবো না।’ এরপর বাতিল করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ অভিযুক্তদের ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁর মুক্তির পরেই রাস্তায় বিজয় মিছিল বের হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই গণআন্দোলনকে।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *