আল মামুন

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

বাঙালি যখনই তার অধিকার চেয়েছে, যখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেয়েছে, তখনই বাঙালির ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী; বাঙালির ওপর চালিয়েছে দমন নীতি। নানাভাবে শোষণ করা হয়েছে বাংলাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

ছয় দফা দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে বাংলার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা শেখ মুজিবকে বারবার কারাগারে পাঠিয়েও দমাতে পারেনি পাকিস্তানিরা। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে তাঁর ওপর একের পর এক মিথ্যা মামলা চাপিয়ে দিতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।

১৯৬৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ছয় দফার প্রচার কাজে সময় অতিবাহিত করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ৮ মে তিনি গ্রেফতার হন। তাঁর সঙ্গে গ্রেফতার হন খন্দকার মোশতাক আহমদ, ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শেখ ফজলুল হক মনি, শেখ সহীদ ও তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াও। শেখ মুজিবসহ অন্যান্য রাজবন্দিদের মুক্তিতে ৭ জুন সাধারণ সভা ডাকে আওয়ামী লীগ। ধর্মঘট পালিত হয় সারা পূর্ব পাকিস্তানে। ধর্মঘট পালনকালে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে ১১ জন আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়। কারাগারে যেতে হয় আট শ’ কর্মীকে। এছাড়াও মোনায়েম সরকার কর্মীদের বিরুদ্ধে এক হাজারেরও বেশি মামলা দায়ের করে।

২১ মাস কারাভোগ শেষে ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে মুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কারাগারের গেটের বাইরে পা রাখার সাথে সাথে তাঁকে আবার ‘পাকিস্তান আর্মি, নেভি এবং এয়ারফোর্স অ্যাক্টে’ গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের পর সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়— ‘শেখ মুজিবুর রহমানসহ গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা ঢাকাস্থ ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সহযোগিরা ভারতের আগরতলায় গোপন বৈঠকে বসে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র করছিল।’

শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তৈরি করা হয়। তারা হচ্ছেন— শেখ মুজিবুর রহমান, কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন এলএস সুলতান উদ্দিন আহমেদ, সিডিআই নূর মোহাম্মদ, আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফুজউল্লাহ, প্রাক্তন কর্পোরাল আবুল বাশার, মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন, রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. ফজলুল হক, ভূপতিভুষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন, সুবেদার আব দুর রাজ্জাক, প্রাক্তন হাবিলদার ক্লার্ক মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. আবদুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহুরুল হক, মো. খুরশীদ, খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান সিএসপি, হাবিলদার আজিজুল হক, মাহফুজুল বারী, সার্জেন্ট শামসুল হক, শামসুল আলম এএমসি, ক্যাপ্টেন মো. আবদুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী মিয়া, ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা এএমসি, ক্যাপ্টেন এ.এন.এম নুরুজ্জামান, সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মো. মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী, লে. এস. এম. এম রহমান, প্রাক্তন সুবেদার এ. কে. এম তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ এএমসি এবং লে. আবদুর রউফ।

মামলার বিচারের জন্য ফৌজদারি দন্ডবিধি সংশোধন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। পাকিস্তান দন্ডবিধির ১২১-ক ধারা এবং ১৩১ ধারায় মামলার শুনানি হয়। শেখ মুজিবকে এক নম্বর আসামি করে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং’ নামে মামলাটি পরিচালিত হয়। ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে একটি কক্ষে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। মোট ১০০টি অনুচ্ছেদ সংবলিত মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়। সরকার পক্ষে মামলার ১১ জন রাজসাক্ষীসহ মোট ২৩২ জন সাক্ষীর তালিকা আদালতে পেশ করা হয়। এর মধ্যে চারজন রাজসাক্ষীকে সরকার পক্ষ থেকে বৈরী ঘোষণা করা হয়। আদালতে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ় কণ্ঠে বলেন— ‘ষড়যন্ত্র করে আমাকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।’
কারাগারের বাইরে তুমুল আন্দোলন আর আদালতে শেখ মুজিবের দৃঢ়তা দেখে থমকে যায় পাকিস্তানি শাসকচক্র। আন্দোলনে একত্রিত হওয়া সবার একটাই দাবি— ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই।’ সারা দেশে সংগঠিত আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ও সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে পাকিস্তান সরকার। জারি করা হয় ১৪৪ ধারা, কারফিউ।

১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর জনসভা থেকে স্লোগান ওঠে— ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’ ৭ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত হরতালে গুলি চালায় সেনাবাহিনী। ৮ ডিসেম্বর হরতালে নিহতদের স্মরণে বায়তুল মোকাররম মসজিদে গায়েবি জানাজা পড়ান ভাসানী।

বাংলার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে পাকিস্তান সরকার। তারা শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেয়। প্রত্যাহার করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *