আল মামুন

ছয় দফা আন্দোলন

ছয় দফা আন্দোলন

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি অধিবাসীরা বিভিন্নভাবে উপেক্ষিত ও অবহেলিত হতে থাকে। আইয়ুব খান, মোনয়েম খান, সবুর খানরা পাকিস্তানকে উপনিবেশ হিসেবে ধরে রেখে শোষণের যন্ত্রে পরিণত করেন। তারা কথা বলেন অস্ত্রের ভাষায়। কিন্তু জীবনবাজি রেখে পথ চলতে দ্বিধা করেন না শেখ মুজিব।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এবং যুক্তফ্রন্টের মধ্যে আপোস রফা হওয়ায় গভর্ণরের শাসনের আবসান ঘটে ১৯৫৫ সালে। প্রাদেশিক পরিষদ বহাল হয়, ক্ষমতায় ফিরে আসে যুক্তফ্রন্ট সরকার। ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্বেই পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়। কিন্তু বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কারণে এবারও সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হয় না। এমনকি যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রণীত দেশের প্রথম সংবিধানও বাতিল করা হয় ১৯৫৮ সালে। এ বছরের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক আইন জারি করে সংবিধান বাতিল করেন। ইস্কান্দার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে যে পথে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেই পথেই তাকে বিদায় করে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান। দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯৬২ সালে তিনি শাসনতন্ত্রের রচনা করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হন। ১৯৬৪-৬৫ সালে এই সংবিধানের আলোকে সমগ্র পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মৌলিক গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে এই নির্বাচনে জয়ী হন আইয়ুব খান।

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ১৭ দিনব্যাপী যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। সোভিয়েত রাশিয়া এবং আমেরিকার হস্তক্ষেপে সেই যুদ্ধেও বিরতি ঘটে। যুদ্ধের সময় বঙ্গভবনে মোনায়েম খান যে সর্বদলীয় সভা ডাকেন সেখানে শেখ হাফিজুর রহমান পূর্ব বাংলার সামরিক অসহায়ত্বের বিষয়টি তুলে ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেন। এ সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করারও জোর দাবি জানান।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের ছয় দফা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বায়ত্বশাসনের দাবি পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণসমর্থন লাভ করে। তাঁর ছয় দফা ছিল কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রচন্ড আঘাত।

শেখ মুজিবের পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিপ্লবী চরিত্র সম্বন্ধে সম্যক ধারণা ছিল। সেই জন্য ছয় দফার বাণী জণগণের কাছে পৌঁছে দিতে সব জায়গায় ছুটে বেড়ান। এ সময় জেল-জুলুম, দমন-পীড়ন শেখ মুজিব ও তাঁর দল আওয়ামী লীগকে থামাতে পারে না।

১৯৬৬ সালের ১৮ জানুয়ারি পত্রিকায় প্রদত্ত বিবৃতি দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ‘তাসখন্দ চুক্তিকে’ স্বাগত জানান। বিবৃতিতে তিনি পাকিস্তানে যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ারও দাবি জানান। এ সময় আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলার বিচার শুরু করে। তাঁর জামিন বাতিল করে ২৩ জানুয়ারি তাঁকে চার ঘণ্টা কারাগারে আবদ্ধ করে রাখা হয়।

২৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২৪(ক) ধারাতে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ‘আপত্তিকর বক্তৃতার’ জন্য নিরাপত্তা আইনের ৭(৩) ধারায় আরও এক বছর কারাদন্ড প্রদান করা হয়। এরপর হাইকোর্টে আপিল সাপেক্ষে শেখ মুজিবের জামিনের আবদেন করা হলে তা না মঞ্জুর করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্টে আপিল জামিনের আবেদন করা হলে বিচারপতি আরটি তালুকদার আপিল গ্রহণ করে তাঁকে জামিন প্রদান করেন। কারাগারের গেটে শেখ মুজিবকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে একটি জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি তাজউদ্দিন আহমদ ও নূরুল ইসলাম চৌধুরী এবং শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে যান। লাহোরে আইয়ুববিরোধী নেতাদের সম্মেলনে শেখ মুজিব ছয় দফা দাবি উত্থাপনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ছয় দফা দেখে শঙ্কিত হন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা। কেননা ছয় দফার মধ্যে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বাংলার পতাকা দেখা যাচ্ছিল। তাই প্রস্তাবটি সম্মেলনের এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে শেখ মুজিব ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াকআউট করেন এবং পরে সাংবাদিকদের কাছে ছয় দফার মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ফিরে আসেন শেখ মুজিব। এ সময় এয়ারপোর্টে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে ছয় দফা উত্থাপন সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। ২১ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে পূর্ব পাকিস্তান অওয়ামী লীগের কার্যকরী সভায় ‘ছয় দফা’ কর্মসূচি বা দাবি অনুমোদিত হয়।

ছয় দফার দাবিগুলো নিম্নরূপ—

প্রথম দফা : সরকারের বৈশিষ্ট্য হবে যৌথরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির; তাতে যৌথরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন হবে প্রত্যক্ষ এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার প্রতিনিধি নির্বাচন জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে।

দ্বিতীয় দফা : কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় এবং তৃতীয় দফায় ব্যবস্থিত শর্তসাপেক্ষ বিষয়।

তৃতীয় দফা : পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা পারস্পরিকভাবে কিংবা অবাধে উভয় অঞ্চলে বিনিময় করা চলবে। অথবা এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু থাকতে পারে এই শর্তে যে, একটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার অধীনে দুই অঞ্চলে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। তাতে এমন বিধান থাকতে হবে যেনো এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সম্পদ হস্তান্তর কিংবা মূলধন পাচার হতে না পারে।

চতুর্থ দফা : রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের যোগান দেওয়া হবে। সংবিধানে নির্দেশিত বিধানের বলে রাজস্বের এই নির্ধারিত অংশ স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে জমা হয়ে যাবে। এহেন সাংবিধানিক বিধানে এমন নিশ্চয়তা থাকবে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন মেটানোর ব্যাপারটি এমন একটি লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে যেনো রাজস্বনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে থাকে।

পঞ্চম দফা : যৌথরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্য যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে, সেই অঙ্গরাজ্যের সরকার যাতে স্বীয় নিয়ন্ত্রণাধীনে তার পৃথক হিসাব রাখতে পারে, সংবিধানে সেরূপ বিধান থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে, সংবিধান নির্দেশিত বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত অনুপাতের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে তা আদায় করা হবে। সংবিধান নির্দেশিত বিধানানুযায়ী দেশের বৈদেশিক নীতির কাঠামোর মধ্যে, যার দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে থাকবে।

ষষ্ঠ দফা : ফলপ্রসূভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কাজে সাহায্যের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোকে মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।

চলবে…

One thought on “ছয় দফা আন্দোলন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *