আল মামুন

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন

১৯৫১ সাল থেকেই প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে বিরোধীদলগুলো। কিন্তু নানা টালবাহানায় নির্বাচন পিছিয়ে দিতে থাকে মুসলিম লীগ সরকার। এরপর ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। নির্বাচন আসন্ন দেখে সব দল প্রস্তুতি নিতে থাকে।

১৯৫২ সালের ২৭ জুলাই শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ‘কৃষক-শ্রমিক পার্টি গঠন করেন। ১৯৫৩ সালের ১৪-১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহে আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিল সভা বসে। সভায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উপস্থিতিতে ‘ইলেকশন অ্যালায়েন্স’ গঠনের প্রস্তাব করেন শেখ মুজিব।

অবশেষে বহু যুক্তিতর্কের পর ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী, একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। তিন নেতা ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরপর এই কর্মসূচি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত চষে বেড়ান তাঁরা।

যুক্তফ্রন্টের প্রধান দুই শরিক পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি ছাড়াও ফ্রন্টে নেজামে ইসলাম পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও খেলাফতে রব্বানী পার্টিও অন্তর্ভুক্ত হয়। সোহরাওয়ার্দী মনোনীত হন যুক্তফ্রন্টের সভাপতি। আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান ও কৃষক শ্রমিক পার্টিও কফিলউদ্দিন চৌধুরীকে যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত হন শেখ মুজিবুর রহমান। ঢাকার ৫৬ নম্বর সিমসন রোডে যুক্তফ্রন্টের অফিস খোলা হয়। আবুল মনসুর আহমেদ প্রস্তুত করেন ‘২১ দফা কর্মসূচি’।

যুক্তফ্রন্টের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল সাধারণ মানুষের কাছে ফজলুল হকের জনপ্রিয়তা এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের মতো একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানী একটি অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে প্রচারে নামার ফলে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়। যুক্তফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর সারা পূর্ব পাকিস্তানে অভ‚তপূর্ব গণজোয়ার দেখা দেয়। শহর-বন্দর, হাটঘাট, অলিতে-গলিতে, বুদ্ধিজীবী-ব্যবসায়ী, ছাত্র-শিক্ষক, ধনী-গরিব সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়— ‘মুসলিম লীগ ধ্বংস হউক, পাকিস্তান জিন্দাবাদ-যুক্তফ্রন্ট জিন্দাবাদ, যুক্তফ্রন্টে ভোট দাও।’

১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়। এই নির্বাচনে ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে ৯৭ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী এবং সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৮টিতে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৩টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি ৪৮টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ২২টি, গণতন্ত্রী দল ১৩টি ও খেলাফতে রব্বানী পার্টি দুটি আসনে জয় পায়। আর ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ আসন পায় মাত্র ৯টি।

পূর্ব বাংলার বিপুল ভোটে যুক্তফ্রন্ট বিজয় লাভের পর একে ফজলুল হক প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করেন। সেই মন্ত্রিসভায় সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সমবায় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *