আল মামুন

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা

অবিভক্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রথম সরকারবিরোধী সংগঠন ছাত্রলীগ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র চার মাস ১৯ দিন পর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি কক্ষে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময়ে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনিই।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ছাত্রলীগের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সোহরাওয়ার্দী সমর্থক পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছাত্রলীগের আব্দুর রহমান চৌধুরী ভিপি পদে নির্বাচিত হন। তার প্যানেলের সবাইই জয়যুক্ত হন।

১৯৪৯ সালের ৮ জানুয়ারি মুসলিম লীগ সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ ‘জুলুম প্রতিরোধ দিবস’ পালনের আহ্বান জানায়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়।

একটু পেছন ফিরে দেখা যাক। ১৯৩০ সালে তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতা আবদুল ওয়াসেক বাছেক কলকাতায় অনুষ্ঠিত এক প্রতিনিধি সম্মেলনে ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র সমিতি’ গঠন করেন। এতে খান বাহাদুর আসাদুজ্জামানকে সভাপতি এবং আব্দুল ওয়াসেককে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এই ছাত্র সংগঠনটি ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার কাজে অংশ নেয়।

এরপর ১৯৩৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সমগ্র বাংলার মুসলিম ছাত্র প্রতিনিধিদের এক সম্মেলনে আব্দুল ওয়াসেককে সভাপতি ও শামসুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সহযোগী সংগঠন ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মত ছাত্রলীগও অভ্যন্তরীণভাবে আবুল হাশিম বনাম নাজিমুদ্দিন-আকরাম খাঁ গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন ইসলামিয়া কলেজকেন্দ্রিক ছাত্ররাই ছিলেন কলকাতার মুসলিম ছাত্রলীগের মূল শক্তি। তারা সবাই ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর সমর্থক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও কিছুদিন শাহ আজিজ-শামসুল হুদার নেতৃত্বে অক্ষুন্ন থাকে, শুধু সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ রাখা হয়। তারা নাজিমুদ্দিন ও নুরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ সরকারের কাছ থেকে সব ধরনের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতে থাকেন। পক্ষান্তরে সোহরাওয়ার্দীর সমর্থনপুষ্ট ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ওপর চালানো হয় জেল-জুলুমসহ নানা নির্যাতন। এমন এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু সমমনা আগের ছাত্রনেতা-কর্মীদের নিয়ে নতুন ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এ বিষয়ে লেখেন— ‘‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের নাম বদলিয়ে ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ করা হয়েছে। শাহ আজিজুর রহমান সাহেবই জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। ঢাকায় কাউন্সিল সভা না করে অন্য কোথাও তারা করলেন গোপনে। কার্যকরী কমিটির সদস্য প্রায় অধিকাংশই ছাত্র নয়, ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে সংগঠনে নির্বাচন হয়েছিল, আর হয় নাই। আমরা ওই কমিটি মানতে চাইলাম না কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ও জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত নয়। আমি ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করলাম। আজিজ আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আব্দুল হামিদ চৌধুরী, দবিরুল ইসলাম, নইমউদ্দিন, মোল্লা জালালউদ্দিন, আব্দুর রহমান চৌধুরী, আব্দুল মতিন খান চৌধুরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেক ছাত্রনেতা একমত হলেন, আমাদের একটা সংগঠন দরকার। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তারিখে ফজলুল হক মুসলিম হলের অ্যাসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হলে সেখানে স্থির হলো একটা ছাত্র সংগঠন করা হবে। যার নাম হবে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ।’ নইমউদ্দিনকে কনভেনর করা হলো।… প্রতিষ্ঠানের অফিস করলাম ১৫০ নম্বর মোগলটুলি।’’
নইমউদ্দিনকে কনভেনর করা হলেও মূলত শেখ মুজিবুর রহমানই ছিলেন নতুন এ সংগঠনের প্রাণশক্তি।

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা উপলব্ধি করেছিলেন, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যে পাকিস্তান গঠন করা হয়েছে সেটা বাঙালির জন্য নয়; বাঙালির ভাগ্য নিয়ন্ত্রক বাঙালিরই হতে হবে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বেলা তিনটায় ঢাকার টিকাটুলির কেএম দাস লেন কাজী হুমায়ুন রশীদের বাসভবন ‘রোজ গার্ডেনে’ একটি সম্মেলন হয়। এতে ৩০০ ডেলিগেট যোগ দেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন এ কে ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, কামরুদ্দীন আহমেদ, মাওলানা রাগিব আহসান, আতাউর রহমান খান, শামসুল হক, ইয়ার মোহাম্মদ খান, তাজউদ্দিন আহমেদ, খান সাহেব ওসমান আলী, খয়রাত হোসেন, শেখ আব্দুল আজিজ, কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আনোয়ারা খাতুন, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, আব্দুস সালাম খান, আব্দুল জব্বার খদ্দর, মাওলানা মোহাম্মদ আরিফ হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।

সম্মেলনের মূল অধিবেশন শুরু হয় আতাউর রহমানের খানের সভাপতিত্বে। আগে থেকেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শ ছিল নতুন দল গঠিত হলে তার নাম যেনো হয় উত্তর-সীমান্ত প্রদেশের মানকি শরীফের দল ‘পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে। মওলানা ভাসানীও এই নামটি প্রস্তাব করেন। তবে তিনি ‘পূর্ব’ শব্দটি যোগ করতে বলেন। সম্মেলনে উপস্থিত সকলেই তাঁর এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। এছাড়া কয়েকজন ডেলিগেট-কাউন্সিলর দলের নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দটি রাখার ব্যাপারে আপত্তি করেন। কেউ কেউ আবার ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নাম রাখার প্রস্তাব দেন। সবাই মনে করতেন, যেহেতু তারা সবাই এক সময়ের মুসলিম লীগ কর্মী, কাজেই ‘মুসলিম’ শব্দটি রেখে দেওয়াই ভালো হবে। সেক্ষেত্রে দলটি হবে ‘আওয়াম’ এর অর্থাৎ জনগণের।

অধিবেশন শেষে মওলানা ভাসানী ৪০ সদস্য বিশিষ্ট একটি সাংগঠনিক কমিটির প্রস্তাব করেন। উপস্থিত সকলেই তার প্রস্তাবে সম্মতি দেন। কমিটিতে সভাপতি হিসেবে থাকেন মওলানা ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক থাকেন শামসুল হক। এছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানকে করা হয় যুগ্ম সম্পাদক। তিনি তখন ছিলেন কারাবন্দি।

১৯৫৩ সালের ১৪-১৬ নভেম্বর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় পর্যন্ত দেশের শতকরা প্রায় ৭০টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সংগঠন গড়ে তুলতে সক্ষম হন বলে বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। সম্মেলনে মওলানা ভাসানী সভাপতি, বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদক ও ইয়ার মোহাম্মদ খান কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন।

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সম্মেলনের জন্য খুব তোড়জোড় চলছিল। আমরা জেলে বসেই সে খবর পাই। ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে অফিস হয়েছে।… শওকত মিয়া, ঢাকার পুরানা লীগ কর্মী ইয়ার মোহাম্মদ খান সহযোগিতা করেছিলেন। ইয়ার মোহাম্মাদ খানের অর্থবল ও জনবল দুইই ছিল। এডভোকেট আতাউর রহমান খান, আমজাদ আলী খান এবং আনোয়ারা খাতুন এমএলএ সহযোগিতা করেছিলেন। আমরা সম্মেলনের ফলাফল সম্বন্ধে খুবই চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, আমার মত নেওয়ার জন্য।… আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করবো, না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন হলে তাতে যোগদান করবো? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্র রাজনীতি আমি করবো না। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই আমি করবো। কারণ বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে।… সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান করলেন; তার নাম দেওয়া হলো ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ।’ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হলো জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম, আমার নামের পাশে লেখা আছে ‘নিরাপত্তা বন্দি’। আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনও আসে নাই, তাই যারা বাইরে আছেন তারা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন।’

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *