আল মামুন

ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিব

ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিব

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী প্রথমেই আঘাত হানে বাংলা ভাষার ওপর। ক্ষমতা দখল করেই বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে দমিয়ে রাখার পরিকল্পনা করে পাকিস্তানিরা। তারা চেয়েছিল সংখ্যালঘু জনগণের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। কিন্তু তাদের সেই অপতৎপরতা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন শেখ মুজিব।

পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের বাঙালি বিদ্বেষী আচরণ প্রথম প্রকাশ পায় বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের বাংলা ভাষা বাদ দিয়ে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। অথচ পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪.৬ শতাংশ ছিল বাঙালি, বাকি জনসংখ্যা ছিল অন্যান্য ভাষাভাষী। এর মধ্যে পাঞ্জাবি ২৭.১ শতাংশ, পশতু ৬.১ শতাংশ, উর্দু ৬ শতাংশ, সিন্ধি ৪.৮ শতাংশ এবং ইংরেজি ১.৪ শতাংশ।

১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গঠিত হয় গণতান্ত্রিক যুবলীগ। এ সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। গৃৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’

দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের একচ্ছত্র অধিপতি হন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এ সময় নবগঠিত দুটি প্রদেশের মধ্যে পূর্ববাংলার প্রতি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ভাষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্ণর জিন্নাহ ঢাকায় তার প্রথম এবং শেষ সফরে এসে ঘোষণা করেন— ‘উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ বাংলার ছাত্র সমাজ তার এই ঘোষণা মেনে নিতে পারে না। তারা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। নেমে আসে রাজপথে। ছাত্রদের সাথে মিছিলে যোগ দেয় বাংলার কৃষক-শ্রমিক জনতাও। তখন গণপরিষদে উর্দু এবং ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি ছিল না।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই সংগঠনটির ভূমিকা খুবই স্মরণীয়। ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা, সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা।

জিন্নাহর ঘোষণার প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তমুদ্দিন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথ সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। রাজনৈতিক কর্মীদের এই সভায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তারই প্রস্তাবে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

শেখ মুজিব ছাড়াও এই সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন শামসুল হক, অলি আহাদ, মুহাম্মদ তোয়াহা, আবুল কাসেম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজিত গুহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমুদ্দিন মজলিস, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, গণআজাদী লীগ, ছাত্রাবাসগুলোর সংসদ প্রভৃতি ছাত্র ও যুব প্রতিষ্ঠানের দুজন করে প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করে। সভায় গণপরিষদের সিদ্ধান্ত ও মুসলিম লীগের বাংলা ভাষাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম।

পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান কুমিল্লার শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ১১ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম হরতাল হয় এদিন। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সারা বাংলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করে বাংলার মানুষ তাদের দাবি তুলে ধরে।

শেখ মুজিব একদল ছাত্র নিয়ে এদিন পূর্ববঙ্গ সরকারের সচিবালয় ঘেরাও করেন এবং কর্মচারীদের হরতাল পালনের আহ্বান জানান। সচিবালয়ের প্রথম গেটে পিকেটিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন— শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ প্রমুখ। আর দ্বিতীয় গেটে ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নওয়াজ, শওকত আলী প্রমুখ নেতা। সচিবালয়ের সামনে পিকেটিং করার সময়েই গ্রেফতার হন কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী, অলি আহাদ, শওকত আলী, রণেশ দাশগুপ্তসহ ৬৫ জন নেতা।

ভারত ভাগের পর, স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে এদিন প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিম উদ্দিন।

ছাত্রসমাজের চাপের মুখে ১৯৪৮ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদ। মার্চের ১৫ তারিখ পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আট দফা চুক্তি করতে বাধ্য হন। চুক্তিপত্রটি সাধারণের সামনে ঘোষণার আগে বন্দি নেতাদের অনুমোদনের জন্য কারাগারে নেওয়া হলে কারাবন্দি অন্যদের সঙ্গে শেখ মুজিব চুক্তির শর্ত দেখেন এবং অনুমোদন প্রদান করেন। এরপর বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে শহীদ মিনারের পেছনের মাঠে অপেক্ষমান জনতার সামনে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানান অধ্যাপক আবুল কাশেম।

ঐতিহাসিক এই চুক্তির ফলে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল এবং চুক্তির শর্ত মোতাবেক শেখ মুজিবসহ অন্য ভাষাসৈনিকরা কারামুক্ত হন।

ভাষা আন্দোলনকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এক সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ১৭ মার্চ একই জায়গায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বানে নঈমুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে আরও একটি সভা হয়। সেই সভায় শেখ মুজিবও অংশগ্রহণ করেন। ওইদিন দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, নঈমুদ্দিন আহমদ, শওকত আলী, আবদুল মতিন, শামসুল হক প্রমুখ যুবনেতাদের কঠোর প্রচেষ্টার ফলে বাংলা ভাষার আন্দোলন সমগ্র পূর্ববাংলায় একটি গণআন্দোলন হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। জনসভা, মিছিল আর স্লোগানে কেঁপে ওঠে সমগ্র বাংলাদেশ। রাস্তায়, দেয়ালে, পোস্টারে— ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ ১৯৪৯ সালে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু দুই বার গ্রেফতার হয়েছিলেন।

ভাষাসৈনিক অলি আহাদ তার ‘জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার নিমিত্তে শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ হতে ১০ মার্চ ঢাকায় আসেন। পরের দিন হরতাল কর্মসূচিতে যুবক শেখ মুজিব এতোটাই উৎসাহিত হয়েছিলেন যে, এ হরতাল তার জীবনের গতিধারা নতুনভাবে প্রবাহিত করে।’

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের উত্তাল পর্বে কারাগারে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে না পারলেও কারাগারে বসে নিয়মিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতেন।
রাজপথে থেকে আন্দোলন ও কারাবরণ, পরে আইনসভার সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *