আল মামুন

কবজি ডুবিয়ে সবজি খাওয়ার দিন শেষ!

কবজি ডুবিয়ে সবজি খাওয়ার দিন শেষ!

আল মামুন

বাংলাদেশের মানুষ এর আগে কখনো ১০০ টাকা কেজিতে কোনো সবজি কিনেছে কিনা আমার জানা নেই। তবে এখন কিনে খেতে হচ্ছে। খেতে হচ্ছে কারণ বাঁচতে হচ্ছে। এমনিতেই মহামারি করোনাকালে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, তারপর আবার ঊর্ধ্বমুখী ভোগ্যপণ্যের দাম। এ যেনো মরার ওপর খাঁড়ার ঘা!

গত কয়েক মাসে মহামারি করোনার প্রভাবে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে দেশে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ সঞ্চয়ের শেষ অংশটুকুও আজ হারিয়ে পথে বসেছে। জীবনযাপন করেত যথারীতি হাঁপিয়ে উঠছে এসব মানুষ। তিমির রাত্রিতে হাতড়িয়ে পথ খোঁজা মানুষেরা আজ দিশেহারা। সব জিনিসেরই দাম আকাশচুম্বী। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দর শুনে, দাম গুনে সাধারণ মানুষ ঘামছে দরদর করে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আজ নাভিশ্বাস উঠেছে। তাদের দীর্ঘশ্বাসের আদ্রতায় বাতাস ভারও বেড়ে যাচ্ছে। কবজি ডুবিয়ে সবজি খাওয়ার কথা বলা হলেও সেই বুঝি শেষ হতে চলল!

অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে পণ্যমূল্যের দাম। লাগাম টানার নানা প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও অবস্থা তথৈবচ। বরং প্রতিদিনই নিত্যপণ্যের উত্তাপে নাকাল হচ্ছে ভোক্তা সাধারণ। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে পেঁয়াজের পর চাল, এরপর আলুর দাম বেড়ে গেল। এ তিনটি নিত্যপণ্য কিনতে প্রায় দ্বিগুণ বেশি খরচ গুনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও অধিকাংশ সবজির দাম ৮০ টাকার ওপরে। একাধিক সবজির দর ১০০ টাকার ওপরে। সঙ্গে ডাল, ভোজ্যতেল, ডিমসহ বেশিরভাগ নিত্যপণ্য বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে এসব জিনিসপত্র কিনতে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। আর এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুসারে, মহামারি করোনার কারণে বাংলাদেশে দরিদ্র হয়েছেন নতুন করে এক কোটি মানুষ। এ সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থবিরতার কারণে অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। আর দেশের এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দামে মানুষ আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে।

ভোগ্যপণ্যের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তা স্বাভাবিক নয় বলেই সংশ্লিষ্টদের অভিমত। অভিযোগ, মিল মালিকরা নীরবে প্রতি বস্তায় চালের দাম ২০০-২৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যার প্রভাবে পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এবার সরকার বোরো ধান সংগ্রহ ঠিকমতো করতে পারেনি। এ সুযোগে মিল মালিকরা ধান কিনে এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সিন্ডিকেট করে সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়েছে বলে জানা যায়। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে চালের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও মিল মালিকরা তা অমান্য করছেন বলে প্রকাশ। অনুসন্ধান চালালে বেরিয়ে আসবে যে, সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম নিয়েই চলছে নানা কারসাজি। অথচ দাম বাড়ার দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না, বরং একজন আরেকজনের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়। তবে বিষয়টি নজরদারির দায়িত্ব অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে।

বৈশ্বিক মহামারিতে শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দায় এখন গোটা দুনিয়া। দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের জন্য এ আক্রমণ মোকাবিলা করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এপ্রিলে সারাদেশের নিম্নআয়ের মানুষের ওপর ব্র্যাকের এক জরিপ থেকে জানা যায়, কোভিডে ৭৫ শতাংশ নিম্নবিত্তের মানুষের আয় কমেছে। দরিদ্রদের ৮৯ ভাগ মানুষ অতিদারিদ্র্যের কাতারে নেমে এসেছে। ১৪ শতাংশ মানুষের ঘরে খাবার সংকট। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। বেতন-ভাতা কাটছাঁট হয়েছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে। কমবেশি আয় ও মুনাফা কমেছে। অধিকাংশ শ্রেণি-পেশার মানুষের আয়েই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এ অবস্থায় নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের টিকে থাকাই দুরূহ হয়ে পড়বে। তাই দেশের এই সন্ধিক্ষণে নিত্যপণ্যের দামে কোনো রকম কারসাজি হলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এ নিয়ে সময়ক্ষেপণ কিছুতেই প্রত্যাশিত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *